রাজবাড়ী, ৯ই মাঘ, ১৪২৭ বঙ্গাব্দ, শনিবার, ২৩ জানুয়ারী ২০২১

আমার বাবু খায় না………ডাঃ খালিদ আহমেদ সাইফুল্লাহ

প্রকাশ: ২৩ অক্টোবর, ২০২০ ৭:১৭ : অপরাহ্ণ

নিজস্ব প্রতিবেদক :রাজকন্ঠ ডট কম
(লিখাটা দীর্ঘ। পাঠকদের অনুরোধ করছি, পুরোটা পড়ার জন্য)
আরহাম রহমান (১৭ মাস) এর ডাক পরতেই মা আনিসা রহমান (নাম ছদ্ম, ঘটনা সত্য) একটা হৃষ্টপুষ্ট বাবুকে নিয়ে চেম্বারে ঢুকলেন। বাবুটার মুখের শিশুশুলভ কোমলতা উবে গেছে থলথলে চর্বির অশ্লীল আধিক্যে। চেয়ারে বসতেই মায়ের হাহাকার, “স্যার! আমার বাবুটা না খেতে খেতে একদম শুকিয়ে গেছে”।
আমার অনুসন্ধৎসু চোখ পুরো চেম্বারে ঘুরছে সেই ‘শুকিয়ে যাওয়া’ বাবুর খোঁজে (আমার সামনে যে বাবুটা আছে তার জন্য যে ‘শুকিয়ে গেছে’ শব্দটা বড্ড বেমানান)। সেরকম কাউকে না পেয়ে আমার জিজ্ঞেস, ” আপনার বাবুটা কোথায়? ”
মাঃ এ-ই তো আমার বাবু!
আমি অনেক কসরত করে বিস্ময় লুকিয়ে শান্ত ভাবে বাবুটার ওজন নিলাম। ১৬.৩ কেজি মাত্র!!
খাবারের ইতিহাস জানতে আমার জিজ্ঞাসাঃ
–আরহাম গতকাল সারাদিনে কি কি খেয়েছে তা কি আপনি বলতে পারবেন?
মায়ের চটপট উত্তরঃ “আচ্ছা, এক এক করে বলি; সকালে একটা ডিম দিলাম, খেলো। দুপুরের ডিমটা কষ্ট করে খেলো। সন্ধ্যার ডিমটা অর্ধেক খেলো আর রাতের ডিমটা জোর করেও খাওয়ানো গেলো না!!” (মায়ের শব্দচয়ন সহ পুরো ঘটনাটি পাঠকবৃন্দ কে বিশ্বাস করার জন্য আমি জোড় অনুরোধ করছি)।
আমি এ পর্যায়ে মা কে থামিয়ে দিয়ে বললাম, ‘ঠিক আছে, আমি বুঝতে পারছি। আপনার অন্য খাবারগুলো কষ্টসাধ্য খাওয়ানোর বর্ণনা আর না দিলেও চলবে।’
শান্ত বাচ্চাটির শারিরীক পরীক্ষা শেষে মাকে বোঝানোর লক্ষ্যে আমি বলতে শুরু করলামঃ
~~ দেখুন, ১৭ মাস বয়সে একটা বাচ্চার স্বাভাবিক ওজন আমরা ১০-১১ কেজি আশা করি। সে তুলনায় আপনার বাচ্চার ওজন যথেষ্ট ই বেশী ………………….। কথার শেষ দিকে অল্প বয়সে বেশি ওজনের (childhood obesity) কুফল বর্ণনা সহ অনেক কিছুই বোঝানোর চেষ্টা করলাম। অনেক চেষ্টা করে ও আমি তাকে আমার বক্তব্য বোঝাতে ব্যর্থ হলাম। শেষে তিনি মুখ ভার করে উঠে চলে গেলেন। বাচ্চাটি যখন মায়ের সাথে প্রস্থান করছিল, তার শরীরের ভার বহন করার কষ্টকর প্রচেষ্টা তার কিঞ্চিৎ শ্বাসকষ্টের কারণ বলে আমার কাছে প্রতীয়মান হচ্ছিল। যাওয়ার সময় মা হয়ত ভাবছিলেন, ‘ভিজিটের টাকাটাই জলে গেলো। ‘
আমিও তখন মনে মনে আফসোস করছিলাম, ‘আহা! বেচারি যদি আমার কথাগুলো বুঝতো/ মানতো!’
এরকম বা এর কাছাকাছি ঘটনা আমার মতো শিশু চিকিৎসকের চেম্বারের প্রতিদিনের চিত্র। বাচ্চার মাথা ব্যাথা থাকুক বা পেট ব্যাথা, জ্বর থাকুক বা পাতলা পায়খানা, সাথে একটা কমন কথা প্রায় সব সময়ই থাকবেঃ ‘আমার বাবু কিছুই খায় না’।
অথচ অধিকাংশ ক্ষেত্রে আমরা এখনকার বাচ্চাদের সঠিক ওজন বা স্বাভাবিক এর তুলনায় বেশি ওজন পেয়ে থাকি।
সত্যিকার ব্যাপার হলো, মায়েদের মনের সাইজ বড় আর বাচ্চাদের পেটের সাইজ থাকে ছোট। আর তাই, মায়ের মন আর বাচ্চার পেটের এই যুদ্ধে বাচ্চা হয় পরাস্ত। বাচ্চাগুলো প্রথম বছরের শেষ থেকে ৪/৫ বছর পর্যন্ত এমনিতেই একটু কম খায়। আর এ সময়েই মায়েদের খাওয়ানোর ইচ্ছা, প্রচেষ্ট বা আগ্রহ থাকে সবচেয়ে বেশী।
ফলাফলঃ নতুন প্রজন্ম বেড়ে উঠছে স্থুলতা কে সঙ্গী করে অথবা প্রচন্ড খাদ্য ভীতি নিয়ে।
যে খাবার শৈশবকালীন অন্যতম বড় বিনোদন হওয়ার কথা ছিল তা আজ বাচ্চাদের অন্যতম ভীতির কারণ হয়ে দাড়িয়েছে।
আসুন, একটা অংক করে আজকের দীর্ঘ লেখাটা শেষ করিঃ
এক থেকে ৬ বছর পর্যন্ত বাচ্চাদের বয়স অনুযায়ী মোটামুটি ওজনের সুত্র হলো~~
“”বয়স(বছর) ×২+৭(অথবা ৮)।””
যেমনঃ তিন বছর বয়সে একটি বাচ্চার মোটামুটি ওজন হবার কথাঃ
বয়স(৩)×২+৭(অথবা ৮)=১৩/১৪ কেজি।
পাদটীকাঃ স্বাভাবিক ভাবে বেড়ে ওঠা একটি বাচ্চা জন্মের প্রথম বছরে জন্ম ওজনের সাথে যোগ করে ৬/৭ কেজি, পরবর্তী পাঁচ বছরে প্রতি বছর যোগ করে মাত্র ২ কেজি।
~~~~~~~~~~~~~~~~
ডাঃ খালিদ আহমেদ সাইফুল্লাহ।
সহকারী অধ্যাপক (শিশু)
ফরিদপুর মেডিকেল কলেজ, ফরিদপুর।

Facebook Comments