রাজবাড়ী, ৫ই আশ্বিন, ১৪২৭ বঙ্গাব্দ, রোববার, ২০ সেপ্টেম্বর ২০২০

করলা বা উচ্ছের যত গুন —–ড. শেখ মহঃ রেজাউল ইসলাম

প্রকাশ: ১ সেপ্টেম্বর, ২০২০ ৫:৫৮ : অপরাহ্ণ

স্টাফ রিপোর্টার:রাজকন্ঠ ডট কম
করলা বা উচ্ছে ঔষধি গুন সম্পন্ন এবং উচ্চ মাত্রার খাদ্যমান সম্বলিত একটি সবজি ।এই সবজি অনেকেই নিয়মিত খান।এটা খুব হাইফাই ও প্রেস্টিজিয়াস সবজি বলে আমার কাছে মনে হয়েছে । Cucurbitaceae বা কুমড়া পরিবারের অন্তর্ভুক্ত এই সব্জিটি পরিবারের অন্যান্য সদস্যদের চেয়ে বলতে গেলে বেশী বেশী খাদ্যমান বহন করে। তাছাড়া ঔষধি গুন তো আছেই। এর বৈজ্ঞানিক নাম Momordica contrarianL.
আমরা অনেকেই কোনটা করলা বা কোনটা উচ্ছে তা কনফিউজড করে ফেলি। আসলে এ বিষয়টা নিয়ে অনেক লিটারেচার ঘেটেছি। কোথাও পাইনি। উল্লেখ্য যে আমি একজন কৃষিবিদ এবং উদ্যানতত্ত্ব বিষয়ে আমি পিএইচডি করেছি। উচ্ছে বা করলার উপর ছিল আমার পিএইচডির গবেষণা । অনেক খোঁজাখুৃঁজি করেও আমি উচ্ছে এবং করলার পাথ’ক্য কি পাচ্ছিলাম না।আমার পিএইচডি গাইড ড. নাসরিন ম্যাডামকে জানালে উনি বললেন রেজাউল ভাই, এটা খুঁজে বের করেন প্লিজ। এ সংক্রান্ত তথ্য কিছুটা হলেও জানা দরকার।ড. নাসরিন ম্যাডাম আমার এক বছরের জুনিয়র ছিলেন এবং আমাকে রেজাউল ভাই বলেই সম্বোধন করতেন। ।অত্যন্ত ভদ্র, পরিচ্ছন্ন এবং দক্ষ প্রফেসর ছিলেন আমাদের ম্যাডাম।
তিনি ছিলেন অসম্ভব ভাল মানুষ। আচার, আচরণ, কথা বাতা’য় যে কেউ মুগ্ধ হবার মত।পিএইচডি গাইড স্যাররা অনেকেই অনেক সময় যা ভুংভাং করে আর কথার বোমা মারেন তার কোনটাই ম্যাডামের ভিতর পাইনি কোনদিন বরং ম্যাডামই আমাকে খুব শ্রদ্ধা করতেন।সবাই তাঁকে পছন্দ করে।বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের সবার মুখে মুখে ছিল ম্যাডামের কথা।পিএইচডি গাইড স্যাররা যত রাগারাগি করেন ছাত্রদের ভালোর জন্যই করেন।আমার অনেক কলিগকে রাগে অভিমানে পিএইচডি না করেই চলে আসার সিদ্ধান্ত নিতে দেখেছি,কিন্তু শেষমেষ পারেনি।আমি গাজিপুর জেলায় অবস্থিত বংঙ্গ
বন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পিএইচডি করেছি বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মন্ত্রণালয়ের একটা স্কলারশিপ নিয়ে।ভিসি স্যার থেকে শুরু করে শিক্ষকমন্ডলী,ছাত্রছাত্রী, পিয়ন দারোয়ান, মাঠের শ্রমিক সবাই আমার ভাল জানতেন। কি জন্য জানি না।চলে আসার সময় মাঠের অনেক শ্রমিককে কাঁদতে দেখেছি।অনেকের সাথে এখনও যোগাযোগ আছে। এখনো ওদিকে গেলে ড্রাইভারকে বলি গাড়ী ঘুরাতে। সুযোগ পেলে দেখে আসি আমার প্রিয় ক্যাম্পাসকে।ড.নাসরিন ম্যাডাম এর সাথে কো-গাইড হিসেবে ছিলেন ড. মোফাজ্জল স্যার,ড.গোলাম রসুল স্যার,ড. তোফাজ্জেল স্যার। সবাই অসম্ভব ভাল মানুষ, আমাকে অনুপ্রেরণা দিয়েছেন, স্নেহ দিয়েছেন। সাহায্য করেছেন। ড. মোফাজ্জল স্যার আপেল কুলের উদ্ভাবক।গবেষণার সেই আপেল কুলের সায়ন ( গাছের অংশ যার মধ্যে ওই আপেল কুলের অরিজিনাল বৈশিষ্ঠ আছে,বিষয়টা সব ধরনের গাছের জন্যই প্রযোজ্য) নিয়ে আমি হাজার হাজার আপেল কুলের সম্প্রসারণ করেছি।
কথা বলছিলাম উচ্ছে আর করলার পাথ’ক্য নিয়ে।
যাইহোক,শেষে কিছুটা হলেও ধারণা পেলাম একটা লিটারেচার থেকে। সাধারনত ছোটগুলোকে উচ্ছে এবং বড়গুলোকে করলা বলে।অর্থাৎ একেবারে ছোট থেকে ৫-৭ সেন্টিমিটার লম্বাগুলোকে উচ্ছে এবং তার চেয়ে বড়গুলোকে করলা বলে। উভয়ের ক্রোমজম সংখ্যা সমান(2n = 22)।আবার করলার চেয়ে আকারে অনেক ছোট উচ্ছের খাদ্যমান(Food value) বেশী। আমার গবেষণায় আমি তাই পেয়েছি যাকে বহু রিভিউ সাপোট’ করে।করলা বা উচ্ছের ভিতর Momordicasoids নামে একটা উপাদান আছে এবং এর উপর নির্ভর করে করলার তিতা(bitterness) ভাব। Momordicasoids বেশী থাকলে তিতা বেশী হয়। আবার যেগুলো সাদাটে সেগুলো কম তিতা আর বেশী সবুজগুলো বেশী তিতা। আমি অবশ্য বাজারে গেলে বেশী তিতাটাই কিনি।করলা একটা খান্দানী সবজি।যেকোনো অতিথি আপ্যায়নে মেনুতে করলা ভাজি যেন চাই-ই চাই।তাতে মান সন্মান একটু বাড়ে বলে আমার কাছে মনে হয়েছে।করলার সাথে দেশী ছোট চিংড়ি মাছ হলে ভাল হয়।চমৎকার ভাজি! আমি অবশ্য আমার সারাজীবন অতিথিদের(বিদেশি সহ) আপ্যায়ন এর সময় মেন্যুতে করলা ভাজি রেখেছি। মাঝে মাঝে সপ্তাহে ৩/৪ দিন করলার জুস খাওয়া উপকারী। আমি অবশ্য এই প্রাক্টিসটা করি।কিন্তু এটা রেডি করা ঝামেলা। আমার প্রানপ্রিয় স্ত্রী এগুলো রেডি করে দিত,এখন আর পারে না।বেচারি আর কত করবে? আমিও চুপচাপ থাকি। করলার ভিতরের সব উপাদান সব ভাবেই আমাদের উপকারে আসে।খাদ্য তালিকায় প্রায় প্রতিদিন করলা কোন না কোন ভাবে রাখা ভাল।এতে শরীরে অন্য ধরনের একটা সুখের অনুভূতি হয়।জুস তো খাবেনই। এক সপ্তাহ জুস খেয়ে দেখেন নিজেই বুঝবেন কত ভাল থাকছেন।
আমি খুব সংক্ষেপে করলা বা উচ্ছের খাদ্যমান ও ঔষধিগুন উপস্থাপন করছি।
১। আগেই বলেছি,করলা বা উচ্ছে অত্যন্ত উচ্চ খাদ্যমান সম্পন্ন সবজি। এর ভিতর বিভিন্ন ধরনের ভিটামিন আছে।যেমন ভিটামিন বি১,ভিটামিন বি২,ভিটামিন৩,ভিটামিন সি।তাছাড়া আছে ফোলেট,জিংক,ম্যাংগানিজ,কপার,কোবাল্ট,নিকেল, ফসফরাস,সালফার,ক্যালসিয়াম ,উচ্চ মাত্রায় আয়রন।লিপিড,প্রোটিনও আছে।বেশ পরিমানে আঁশযুক্ত অংশ (dietary fibre) আছে। কিছু এমাইনো এসিড আছে যা পরবর্তীতে প্রোটিনে রুপান্তরিত হয়।
২।করলা বা উচ্ছে রক্ত পরিস্কার করে।করলার রস শরীরের ভিতরের অনুজৈবিক কাযা’বলী(Microbial activities)হ্রাস করে অর্থাৎ শরীরে রোগ হতে বাধার সৃষ্টি করে। করলা রসের এন্টিঅক্সিড্যান্ট ধম’ রক্তের দুষিত পদার্থ বের করে দেয়,রক্তের যেকোনো ধরনের অস্বাভাবিকতা রোধ করে। এলাজি’,র্যাশসহ যে কোন ধরনের চম’ রোগ নিয়ন্ত্রণ করে।রক্তের চলাচল সুন্দর ও স্বাভাবিক করে। এমনকি ক্যান্সার কোষ হতে বাধার সৃষ্টি করে। করলা বা করলার রস রক্ত জমাট বাঁধতে সাহায্য করে এবং এন্টিবায়োটিকের মত কাজ করে।এ ব্যাপারে আমার আলাদা ধরনের একটা পয’বেক্ষন আছে।আমি তখন পিএইচডি করি।মাঠে ও ল্যাবে আমি গবেষণা করতাম।আমার স্ত্রী এলিজা আমাকে সাহায্য করতো। করলার প্রসেসিং ও সংরক্ষণের উপর কিছু কাজ করেছি। এজন্য করলাকে বিভিন্ন পুরুত্বে ( Thikness) চাকা চাকা করে কাটা লেগেছিল। এই কাজে এলিজা আমাকে সাহায্য করার সময় হঠাৎ ওর হাত কেটে বেশ রক্ত বের হয়।রাত তখন গভীর। ডাক্তার পাব কিভাবে?ওই ভাবেই এলিজা কাজ করছিল।একেবারেই আশ্চর্য করে দিয়ে অল্প সময়ের ভিতরই ওর হাতের রক্ত পরা বন্ধ হয়ে যায়। এমনকি কেটে যাওয়ার চিহ্নটা পয’ন্ত দেখা যাচ্ছিলো না। অর্থাৎ কাটাস্থানে করলা বা উচ্ছের বা এর পাতার রস লাগালে রক্ত পড়া বন্ধ হয়।
৩। করলার রস শরীরের ওজন কমাতে সাহায্য করে। করলা নিয়মিত খেলেও একই ফল পাওয়া যায়। এটা লিভারকে উত্তেজিত করে, এতে লিভার থেকে এসিড নিঃসৃত হয়।এই এসিড শরীরের ফ্যাট গলাতে এবং
বিপাক ক্রিয়ায়(Metabolic activities) সাহায্য করে। প্রতি ১০০ গ্রাম করলার ভিতর ১৭ ক্যালরি তাপ থাকে। এই হিসাবে করলা শরীরে বেশ তাপ উৎপাদন করে শরীরকে তরতাজা রাখে।এটা অনুভব অনুভূতিতে বুঝা যায়।শরীরের ফিটনেসও আসে এতে।
৪। করলার ভিতর প্রচুর ভিটামিন সি থাকাতে এটা এন্টিভাইরাস হিসাবে কাজ করে।অর্থাৎ রোগ প্রতিরোধক হিসাবে কাজ করে।
৫।করলা ডায়াবেটিস রোগ নিরাময়ে যথেষ্ট ভূমিকা রাখে।করলার ভিতর ইনসুলিন এর ন্যায় প্রোটিন আছে যেটাকে বলা হয় পলিপেপ্টাইড পি। এটা ইনসুলিন বৃদ্ধি ও এর কায’কারিতা বাড়ায়।ইনসুলিনের বৃদ্ধির ফলে রক্তের সুগার কমে যায় ও ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রনে থাকে।সেদিন আমার অফিসে কথায় কথায় একজন সিরিয়াস ডায়াবেটিস আক্রান্ত ব্যক্তি জানালেন তিনি নিয়মিত করলার রস খান এবং কোন রকম ইনসুলিন নেয়া ছাড়া খুব ভাল আছেন, ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণে আছে।এটাও জানালেন এতে সুগার একেবারেই কমে যায়।আমার মতে রেগুলার করলার জুস না খেয়ে সপ্তাহে ৩/৪ দিন খাওয়া ভাল অথবা এ ব্যাপারে ডাক্তারের পরামর্শ নিতে পারেন।
৬।নিয়মিত করলার জুস ও করলা খেলে ত্বকের উজ্জ্বলতা (Glowing appearance ) বাড়ে।
৭। ব্রেস্ট ক্যান্সার এর কোষ উৎপাদনে বাঁধার সৃস্টি করে।
৮। প্লিহা,যকৃত ইত্যাদির রোগ নিরাময় করে ও এগুলো সতেজ রাখে।
৯। করলা গাছের পাতার রস খাওয়া যায় এবং পাতা সবজি হিসেবে ভেজে খাওয়া যায়।
১০। শরীরের ক্ষতস্থানে করলা পাতা বেটে পেস্ট করে লাগালে সুফল পাওয়া যায়।
১১। জৈব কীটনাশক (Organic insecticide)হিসেবে এবং জৈব ছত্রাকনাশক (Organic fungicide) হিসেবে করলা এবং করলার পাতার রস ব্যবহার করা যায়।
১২। বীজ শোধন (Seed treatment) এর কাজে করলার রস ব্যবহার করা যায়।
১৩। করলা কৃমিনাশক (Nematicides) হিসেবে কাজ করে।
করলা তিতা কিন্তু এর গুনাগুন যথেষ্ট। অনেক মিস্টি সবজির ভিতরও এতো গুন নাই। করলার ভিতর ব্রকলির চেয়ে দ্বিগুণ পরিমান বেটা-ক্যারোটিন, পালং শাকের চেয়ে দ্বিগুণ পরিমান বেশী ক্যালসিয়াম, কলার চেয়ে দ্বিগুণ পরিমান বেশী পটাশিয়াম রয়েছে।বিষয়টাকে এভাবে বলা যায় যে, মানুষের খারাপ ব্যবহারেও বিরক্ত হবেন না তার ভিতর ভালো কিছু আছে যা আপনার কাজে লাগতে পারে।আবার গায়ের রঙ দুধে আলতা এবং চেহারা মারাত্মক সুন্দর এটা দেখেও হুমড়ি খেয়ে পরবেন না। দেখুন,শুনুন,বুঝুন তারপর সিদ্ধান্ত নিন।বুঝাচ্ছিলাম তিতা করলা আর মিস্টি সবজির গুনাগুন।
আমাদের উচিৎ নিয়মিত করলা সবজি হিসেবে ও করলার জুস ওষুধ হিসেবে খাওয়া। করলা গ্রীষ্মকালীন সবজি হলেও সারা বছর এর চাষ করা যায়। শীতের সময় এর ফলন কিছুটা কম হয়।যারা শহরে বাস করেন তারা নিজের বারান্দায় টবে লাগাতে পারেন।সরাসরি বীজ বপন বা চারা তৈরি করে এর চাষ করতে পারেন। ভাল নাসা’রী থেকেও চারা সংগ্রহ করতে পারেন।একটা টবে দুটো করে চারা রোপণ করা যেতে পারে। সারা বছর নিজের উৎপাদিত করলা বা উচ্ছে খান,সুস্থ থাকুন।
বিঃ দ্রঃ করলা মানে আমি উচ্ছে আর করলা দুটোই বুঝিয়েছি।ছোট আকারের উচ্ছের স্বাদ বেশী এবং খাদ্যমানও বেশী।
Facebook Comments