রাজবাড়ী, ১০ই অগ্রহায়ণ, ১৪২৭ বঙ্গাব্দ, বুধবার, ২৫ নভেম্বর ২০২০

জটা জলিলের জানাজা——–এড. লিয়াকত আলী বাবু

প্রকাশ: ২৫ জুলাই, ২০২০ ৯:৫০ : অপরাহ্ণ

রাজকন্ঠ নিউজ ডেস্ক:


বাঁশ কাটার ফটাশ ফটাশ শব্দ হচ্ছে। বাঁশ কাটার শব্দ শুনে দুর্বলদের হার্টে ড্রপ বিট দিচ্ছে। মরা বাড়ীতে বাঁশ কাটার শব্দ শুনলে সকলেরই হার্ট বীট অনিয়ন্ত্রিত হয়ে যায়। সাথে আগরবাতির গাঢ় গন্ধ মরা বাড়ির পরিবেশটাকে আরও ভয়ার্ত করে তোলে। জটা জলিলের বড় ভাই খলিল পাশা চারিদিকে দৌড়াদৌড়ি করে চিল্লাইয়ে চিল্লায়ে বলছে- এই কিডা কনে আছিসরে,তোরা সবার খবর দে,মাইক লাগায়ে দে। এই আমাগোরে এতিম করে রাইখে মিয়ে ভাই চলে গেলোরে, মাথায় বারি হয়া গেছেরে আমাগোরে,মাথায় বারি হয়া গেছে। আমাগোরে এহন কি হবিনি ? বাড়ীর মধ্যেও কান্দা কাটির আওয়াজ পাওয়া যাচ্ছে। পাশেই জটা জলিলের বিশাল দেহের কাফনে মোড়ানো লাশ শোয়ানো হয়েছে খাটিয়ার উপর। অনেকেই খাটিয়া দেখলে চট করে মুখ ঘুড়িয়ে নেয়। কারন খাটিয়া দেখলেই চোখের সামনে লাশের ছবি ভেসে উঠে। জটা জলিলের লাশ শুইয়ে রাখার এমন দৃশ্য দেখে অনেকেরই বুকের ভীতরটাতে অজানা আশঙ্খায় চিলিক্ দিয়ে উঠছে। লাশের পাশে বাঁশ কাটতে দেখলে সবারই মনের মধ্যে এমনটাই হয়। যাদের বয়স বেশী তাদের ভয়টাও একটু বেশী। মরন কেন যেন মনের অজান্তেই স্মরনে চলে আসে। বাড়ীর পশ্চিম আঙ্গিনার বিশাল আমগাছটার নিচে খাটিয়ার উপর রাখা জটা জলিলের লাশটা আজ যেন একটা নিথর নিস্তব্দ পাথরের ইতিহাস হয়ে পড়ে আছে। কত কথা,কত গল্প, কত বাহাদুরী। কিন্তু আজ সবই নিস্তেজ। আজ সেই সব বাহাদুরের মত গল্প বলা মানুষটাকে সাদা ধবধবে কাফনের কাপড় দিয়ে সমস্ত শরীর মোড়িয়ে শোয়ায়ে রাখা হয়েছে সযত্বে। জটা জলিলের মুখটা গামছা দিয়ে বেঁধে রাখা হয়েছে। মৃত্যুর সময় কি কারনে যেন হতভাগাটার মুখটা একবারে ‘হা’ হয়ে ছিলো। এরপর আর কিছুতেই বন্ধ কারা যায় নাই। এ কারনেই মুখটা গামছা দিয়ে শক্ত করে বেঁেধ দেওয়া হয়েছে। লাশের ‘হা’ করা মুখ দেখতে খুবই খারাপ লাগে দেখে এমন ব্যবস্থা করা। বাড়ীর পাশের মন্টু মৌলভী মুরদার মুখ দেখানোর দ্বায়ীত্বে ব্যস্ত আছেন। মন্টু মৌলভী মৃদু স্বরে দোয়া দরুদ পড়ছেন। আত্বীয় স্বজন সহ এলাকার লোকজন ভীর করে শেষ বারের মত জটা জলিলের মুখখানা একবার করে দেখে নিচ্ছে। গোলাপ জল আর জ¦লন্ত লোবান বাতির ধোঁয়ার গন্ধ বাতাসে ভেসে বেড়াচ্ছে। গোলাপ জল আর লোবান কাঠির ধোঁয়ার গন্ধের মাঝে সব সময়ই লাশ লাশ একটা গন্ধ পাওয়া যায়। মুরদার চারিপাশে রাখা আগর বাতি থেকে এমনই একটা ভয় জড়ানো গাঢ় গন্ধ ভেসে আসছে।
বাদ মাগরিব জটা জলিলের জানাজা পড়ানো হবে। এদিকে গ্রামের ফজের আলী,হোসেন মোল্লা ও শুকুর মন্ডল সহ অনেকেই মনের দুঃখে পায়চারী করতে করতে মাঝে মাঝেই কলিজা ছিদ্রি করা দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে নিজের বুকে নিজেরাই থাপ্পর মেরে প্রায়শ্চিত্ত করার চেষ্টা করছে।
আহা! একি দুই এক টাকার বিষয় ? লক্ষ লক্ষ টাকা জলিলের কাছে,অথচ কোন ডকুমেন্টসই নাই। আবার শালার কোন স্বাক্ষীও নাই। সবই ছিলো গোপন লেনদেন। সৌদি আরবে পাঠাতে গিয়ে জটা জলিল আজ নিজেই চাঁন্দের দেশে চলে যাচ্ছে। পানাদাররা ঘুরতে ঘুরতে এক সময় ফজের আলী হোসেন মোল্লাকে জড়িয়ে ধরে বলে উঠে,আয় ভাই আমরা দুইজন দুইজেনর স্বাক্ষী হয়ে যাই। হোসেন মোল্লা দীর্ঘশাস্ব ছেড়ে বলে,আরে বাপুরে এখন আর স্বাক্ষী হয়ে লাভ হবিনি কি ? জলিলের তুই পাবিনি কনে ? জটাতো কিছুই রাইখে যায় নাই। একেবারে খালি হাতে-পায়ে এ্যাম্বুলেন্সে শুয়ে সোজা বাড়ী চলে আয়ছে। কাফনের কাপড় ছাড়া সাথে আর কিছুই নাই। ঢাকায়ও নাকি শালা বস্তির মধ্যেই শুয়ে থাইকতো। একেবারে ফাঁকা বস্তি। একটা কানা কড়িও নাই। একেবারে কিচ্ছু নাই। সব ফকফকা। ফজের আলী হোসেন মোল্লার কথা শুনে একেবারে অসহায়ের মত তাকিয়ে থাকে। আসলেই এখন আর কিছুই করার নাই। অং‘গচ্ছামী অং‘গচ্ছামী বলে নিজেই নিজের মনের কাছে শান্তনা নেওয়া ছাড়া আর উপায় কি ? এই ভাবে আড়ালে আবডালে আরও কয়েক ডজন লোক টাকার শোকের ধীর্ঘশ্বাসে কলিজা ছিদ্র করে দিচ্ছে। কিন্তু প্রকাশ্যে এ ব্যপারে টুশব্দটি পর্যন্তু নাই। পরিস্থিতি দেখে সকলেই একেবারে চুপচাপ। জটা জলিলের মৃত্যু সংবাদ শুনে বাইরের কত লোক যে টাকার শোকে মূর্ছা যাবে তার আর কোন ইয়াত্তা নাই। কারন পৃথিবীতে টাকার শোকের উপর কোন শোক নাই বলেই জ্ঞানী গুনিরা ব্যাখ্যা দিয়ে থাকেন। এ পৃথিবীতে টাকাই হলো নাকি আসল কাকা।
জটা জলিলের জীবনের ছোট খাটো একটা রোমাঞ্চকর ইতিহাস আছে। আসলেই জটা জলিল নিজের এলাকার একজন ঐতিহাসিক লোকই বটে। ছোট বেলা থেকেই জটা জলিল নাকি জ্ঞানী বুদ্ধিজীবীদের মত লেখা পড়ায় খুবই অমনোযোগী ছিল। জ্ঞানীদের ছোট বেলাটা নাকি এমনই কাটে। নিয়মিত স্কুলে না যাওয়া,পরীক্ষায় ফেল করা,অংকে শুন্য পাওয়া,লেখাপড়ায় চরম অমনোযোগী হওয়া এবং চরম উদাসিন্য থাকা ইত্যাদি ইত্যাদি। তারপর যত দিন যায় ততই নাকি জ্ঞানের গজগম্ভীর আলোর বিজলি শিখা বাড়তে থাকে। সর্ব শেষ জ্ঞানের উর্দ্ধমূখী ত্রিশূলটা নাকি একেবারে ব্রম্ম চাঁদির রাজস্থানে গিয়ে পৌঁছে যায়। আর ভাগ্য রেখাটা কখনো একবার রাজস্থানে ঠেকে গেলেই নাকি কেল্লাফতে। তখন নাকি ভাগ্যের ঘোড়াটা লাফাইতে লাফাইতে উর্দ্ধাকাশের দিকে ছুটিয়া চলে। এমন কথা অবশ্য জ্ঞানী গুনিরা বলে থাকেন। দুনিয়ার ইতিহাসটাও নাকি যুগ যুগান্তর ধরে এ ভাবেই ঘুরপাক খাচ্ছে। এরপর অবশ্য চলে উল্টো রথের মেলা। তারপর ধীরে ধীরে গজমতি ‘জ্ঞান’ প্যারালাইসিস রোগে আক্রান্ত হয়ে অবশেষে আস্তে আস্তে অসার হয়ে যেতে থাকে। তখন গজমতি জ্ঞনেরই আর কোন হিতাহিত জ্ঞান থাকে না। গজ-গম্ভির দ্বিগবিজয়ী জ্ঞানীদের এটাই নাকি জীবনের শেষ পরিনতি। ঠিক তেমনই ভাবে জটা জলিলের অবস্থারও কোন হেরফের হয় নাই। এস,এস,সি’র জ্ঞানে গৌরাম্বান্বিত জটা জলিল প্রথম জীবনে গ্রামে হাল্কা পাতলা রাজনীতি মিশ্রিত মাস্তানী করা শুরু করেছিলো। জীবনের প্রথম পদক্ষেপটা অবশ্য একেবারে খারাপ ছিলো না। এ দেশের সর্বোত্তম ব্যবসা হলো রাজনীতি।এদেশের রাজনীতিতে একবার যুৎসই করে টিকে গেলে রাতারাতি আঙ্গুল ফুলে কলাগাছ এবং ঠিকমত একবার পাইপ লাইনে ঢুকে যেতে পারলে রাতারাতি কলাগাছ ফুলে বটগাছের মত বিশাল মহিরুহে রূপান্তরিত হয়ে যাওয়া যায়। শুধু বিবেক নামক বস্তুটাকে শরীর থেকে ছেঁটে ফেলে দিতে হয়। কিন্তু জটা জলিল রাজনীতিতে সেই ভাবে টেকসই করে টিকতে পারে নাই। রাজনীতিতে টিকতে না পেরে পরবর্তীতে জমি কেনা-বেচার দালালী এবং বিভিন্ন অফিস আদালতে চাকুরী দেওয়ার প্রলোভনে প্রতারনা ও কোর্ট কাচারীতে টাউট গিরি করা সহ সর্বশেষ আদম পাচারে পারদর্শী হয়ে উঠে। উত্থানটা এখান থেকেই শুরু। এভাবেই রতনপুর এলাকার জলিল জোয়াদ্দার ওরফে জলিল সাহেব এবং অতঃপর ফরেন জলিল এবং সর্বশেষ জটা জলিল নামে বিখ্যাত হয়ে উঠে। জলিল সাহেব তখন ঢাকার আলো ঝলমলে হালের নিউ-ন্যাশন আপগ্রেটেড অভিজাত এলাকার বাসিন্দা। আধুনিক সমাজের উঁচু তলার ঐ সকল মানুষের (??) সাথে অবাধ চলাফেরা। তাঁর জীবনের সব কিছুতেই যেন উদ্ধত একধরনের আধুনিকতার ছোঁয়া। রাজনীতির ভোমা ভোমা হোমড়া চোমড়াদের সাথে তার গভীর সখ্যতা গড়ে উঠে। ঐ সকল রাজনীতির ভুঁইফোর হাইব্রিডদের অফিস আদালতে এবং কোন কোন রাজনীতিকের বাসা বাড়ীতেও আড্ডা দিতে চলে যেত জটা জলিল। সাথে ট্রিপল ‘এম’ এর সম্প্রসারিত শব্দের সমন্বয়ে জীবনকে যাঁকজোমক এবং রমরমা পরিমন্ডলে সাঁতার কাটাতে থাকে। প্রথম জীবনে রাজনীতিতে ফেল করলেও পরবর্তী জীবনে রাজনৈতিক মহা ত্রিশূলধারীদের তেলে মাথায় আরেকটু বেশি করে তেল ঢেলে দেওয়ার আসল কায়দাটা রপ্ত করে ফেলেছিলো সে। জাষ্ট রাজনীতির মহা দ্রোহ প্রজ্জ্বলন কর্মজজ্ঞের পুরোহিত ঠাকুর হয়ে যাওয়া আরকি। জটা জলিল ভাগ্য উত্থানের আসল রহস্য বুঝে নিয়ে প্রথম থেকেই বর্তমান ধারার রাজনৈতিক মূল দর্শনে দিক্ষা নিয়ে নেয়। জটা জলিল বুঝে ফেলে যে,এদেশে সব চাইতে মজার ব্যবসা হলো কুহকী রাজনীতির পসরা সাজিয়ে বসা। ধরো মারো খাও,যা যেখানে পাও-উপরওয়ালাদের কিছু দাও। আর সেই কায়দা বুঝেই জটা জলিল রাজনীতির রাঘব বোয়ালদের দরবারেই বেশীর ভাগ সময় কাটিয়ে দিতো। এতে লাভ বেশী রিস্ক কম। তবে আসল অনুসঙ্গ হলো পাওয়ার পলিটিক্সে ঠিকমত ঝুলে থাকা। যাকে বলে যুৎসই হুকিং করে ধরে থাকা। কখনোই এর বাইরে যেতে হয় না। এ এক কঠিন গুরু দিক্ষার বিষয়। আর এই পলিটিক্যাল গুরু দিক্ষার বিষয়টা মাথায় রাখতে হয় সব সময়। এ সবই ছিলো জটা জলিলের কুট কৌশুলি আদশের্র এক অভিনব জীবন দর্শন। জটা জলিল নিজের বাহাদুরী দেখানোর জন্য মাঝে মধ্যেই দামী গাড়ী নিয়ে দেশের বাড়ীতে চলে আসতো। গহীন গ্রামের কাাঁচা রাস্তায় দামী গাড়ী! মানে সে যেন এক যুতসই মার্কা বাহাদুরীই বটে। জটা জলিলের বাড়ী আসাতে আবার অনেকই ভয়ে ভীত হয়ে পরতো। কারন জটা জলিল এসেছে বাড়ী,আবার যেন কার শুন্য হবে টাকা পয়সার হাঁড়ি। তবে জটা জলিল একটা বিষয়ে খুবই দক্ষ ছিলো। আর সেটা হলো গ্রামের বাড়ীতে এসেই এলাকার লোকজনদেরকে ডেকে ডেকে নিয়ে চা-সিগারেট খাওয়াতো। ভাবখানা যেন তিনি জমিদার ভুবন নারায়ন চৌধুরী। এই কেউ কিন্তু চা সিগারেটের দাম দিতে যাবিনে কিন্তু। আমি যে কয়দিন বাড়ীতে থাকবো সেই কয়দিন সব খরচা আমার,এ কথা সবার মনে থাকে যেন।
এমনই ভাবে চলছিল দ্বিকবিজয়ী জটা জলিলের জটাগিরী। বহু লোককে সে পথে বসালেও নিজে সোনার রথের মত হাওয়াই জাহজে চড়ে আকাশে আকাশে উড়ে বেড়াতো এদেশে ওদেশে মহা ফুর্তিতে। কত যে আজব দেশের কেচ্ছা কাহিনী শোনাতো সকলকে তার কোন ইয়াত্তা ছিল না। এলাকার মানুষ জটা জলিলের মহা-ম্যাজিক মার্কা জীবন যাপনের গল্প শুনে কপালে চোখ তুলে তাকিয়ে থাকতো অবাক দৃষ্টিতে। সবাই বলতো,বা-আ ব্বা ব্যচারী পারেও বটে। জলিল আমাদের গ্রামের যেন এক মানিক রতন।
জটা জলিলের পারফিউমের ঘ্রান ছিল সাত রকমের রঙের মত। মিনিটে মিনিটে সাত রকমের ঘ্রান ছড়াতো। জলিলের ভাগ্য রেখা নাকি ত্রিভূবনের ত্রিসীমানা ছাড়িয়ে মহীসোপানে পা’রেখেছিলো।
তার পরই নাকি ঐ লক্ষ্মী-কপালে রাজটীকা পরার কথা ছিল। জ্যোতিষের ভাগ্যগননায় জলিলের কপালে নাকি রাজটীকার একটু দাগও পরতে শুরু করেছিলো। কিন্তু বিধি ছিল বাম-তাই হয় নাই কোন কাম। হঠাৎ করেই জটা জলিল ঢাকার ভয়ানক সব পলিটিক্যাল ধান্ধাবাজদের খপ্পরে পরে যায়। পলিটিক্সের বেমোঁচড়ে ছিটকে পরে জলিল। কুহকী রাজনীতি থেকে তার নাম নিশানা খুব ধ্রুত মুছে যেতে থাকে। ভোমা ভোমা ক্যাসিনো পলিটিশিয়ানদের রঙিন চশমায় জীবন দেখতে গিয়ে হঠাৎ করেই অন্ধকার গলিতে হারিয়ে যায় জলিল। তারপর থেকেই জলিলের মহা-জাদুর জগৎ ধীরে ধীরে ছোট হয়ে আসতে থাকে। এ যেন অন্নপূর্নার হিমালয়সম আকাশ ছোঁয়া পাহাড় থেকে সরাৎ করে পিছলে একেবারে নিচেয় পড়ে যাওয়া। একেই নাকি বলে দূভার্গ্যের ড্যাবড়া মোঁচড়। একবার বেমোঁচড়ে পরলে এ ধরনের পিছলা পতন ঠেকানোর নাকি কোন উপায়ই আর থাকে না। এত তাড়াতাড়ি জলিল সাহেবের পতন হয়ে যেতে পারে এ যেন কল্পনারও অতীত। সর্বাধুনিক অভিজাত এলাকার বিলাস বহুল বাড়ী ছেড়ে সর্বশেষ জলিল সাহেব শুধু জলিল নাম ধারন করে পোস্তগোলার এক খুপড়ি মার্কা বস্তিতে গিয়ে আশ্রয় নেয়। এরই মধ্যে আবার হাজারও দুশ্চিন্তা মাথায় নিয়ে তাকে ধীর্ঘদিন জেল হাজতও খাটতে হয়েছে কয়েকবার। হাজত থেকে সুকৌশলে জামিন নিয়েই জটা জলিল পলাতক ফেরারী আসামীর মত আত্মগোপনে চলে যায়। আত্মগোপনে চলে যায় মানে চলে যেতে বাধ্য হয়। এ ভাবেই নিয়তির চিরাচরিত নিয়মে অভিশপ্ত জীবনের ঘনকালো অন্ধকার নেমে আসতে থাকে। শেষের দিকে দুর্ভাগা জলিলকে চেনার আর কোন উপায়ই ছিল না। কপালে অভিশাপের আগুন লাগলে যা হয়। চর্বি ভরা থলথলে সোনার শরীর শুকিয়ে একেবারে হাড্ডিসার। তারপর খোঁচা খোঁচা দাড়িতে তাকে আসল আসামীর মতই মনে হতো। অবশেষে মরার উপর খাড়ার ঘা’র মত হাঁপানির আক্রমনে আর বেশীদিন বাঁচা সম্ভব হলো না জলিলের। এরপর পরকালের হিসাব অনুযায়ী কয়েক শত টন দায় দেনা ঘাড়ে নিয়ে এ এলাকার জটা জলিল অবশেষে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করে বাড়ীর দিকে রওনা দেয়। অবশ্য বাড়ীর দিকে নিজে রওনা দেওয়ার আর সুযোগ ছিল না। নি®প্রান জটা জলিলের লাশটা বহু দিনের বন্ধু বান্ধব মিলে বাড়ীতে নিয়ে এসেছে। এ সবই বন্ধু বান্ধবদের করুণা। তানাহলে ঐ বস্তিইে মরে পচে প্রায়চিত্ত করতে হতো।
আজ তারই নিজের বাড়ীর পশ্চিম আঙ্গিনার আমতলায় খাটিয়র উপর শুয়ে আছে জটা জলিল। সকল বাহাদুরীই আজ শেষ। জীবনের শেষ পরিনতির শেষ বিছানায় আজ একেবারে নিশ্চুপ। এখন তাকে শেষ ঠিকানায় পৌঁছে দেওয়ার জরুরী আয়োজন চলছে। এরই মধ্যে মাগরেবের আজান শুরু হয়ে গেছে। তারাহুরো করে নামাজ শুরুর আগেই লাশ নিয়ে মসজিদের পাশের ঈদগা’র মাঠে নামানো হলো। কালি সন্ধ্যার মাগরেবের ওয়াক্ত। আলো-আঁধারের জটিল সন্ধিক্ষন। এদিকে আষাঢ়ের কালো মেঘে আকাশ আচ্ছন্ন হয়ে পরেছে। বৃষ্টি নামলে লাশ কবরে নামানো বড়ই মুশকিল হয়ে যাবে। দৌড়াদৌড়ি করে অধিকাংশ লোকজন মসজিদে চলে গেল।
মাঠের মধ্যে অনেক লোকই এদিক ওদিক ঘোরাফেরা করছে। তারা ফরজ নামাজ বাদ দিয়ে জানাজার ওয়াজিব নামাজ পড়ার জন্য মহা উদগ্রীব হয়ে মাঠের কোনায় অপেক্ষা করছেন। আমাদের দেশের এ দৃশ্য চিরাচরিত। অনেকে আবার বিড়ি টানতে টানতেই কাতারে দাঁিড়য়ে জ¦লন্ত বিড়ি পায়ের নিচেয় ফেলে পিঁশে ফেলে। অল্পক্ষনের মধ্যেই মাগরেবের নামাজ পরা শেষ হয়ে গেল। ইমাম সাহেব জানাজা নামাজ পড়ানোর জন্য মাইকে কাতার সোজা করে দাঁড়নোর জন্য আহ্বান জানালেন। আশে পাশের অনেকই গুন গুন করে কলেমা শাহাদৎ পড়ে বাতাস ভারী করে তুলছেন। নিয়মানুযায়ী উত্তর-দক্ষিন করে লাশ রাখা হয়েছে। আজ আর জলিলের নিজের কোন কাজ নাই। শুধু খাটিয়াতে টানটান হয়ে শুয়ে থাকা মাত্র। আত্বীয় স্বজন বন্ধু বান্ধব এবং পাড়া প্রতিবেশীরা ঢাকা হতে মাইক্রোবাস ভাড়া করে খুব যত্বের সাথে জলিলের লাশ নিয়ে এসেছে। এর পর খুব ইজ্জতের সাথে গরম পানি দিয়ে গোছল করানো এবং সুন্দর কাফনে জড়িয়ে খাটিয়ার উপর শুইয়ে দেওয়া হয়েছে। এরপর পবিত্র কোরআন শরীফ পাঠ করে শুনানো সহ কাঁধে করে লাশ ঈদের মাঠে নিয়ে যাওয়ার পর সকলেই তাকে আবার কাঁধে করে গোরস্তানে নিয়ে যাবে। জলিলের আজ শুধু খাটিয়ার উপর টান টান হয়ে শুয়ে থাকা ছাড়া আর কোন কাজ নেই। তারপর সবাই মিলে ধরাধরি করে অতি যত্বের সাথে নামিয়ে দেবে কোলাহলহীন মাটির অন্ধকার কবরের মাঝে। মুখটাকে ঘুরিয়ে দেওয়া হবে কেবলা মুখী করে। সবই করা হবে অতি সাবধানতার সাথে। আহা, সামান্য আঘাতও যেন লাশের কোথায়ও না লাগে। জলিল যোয়াদ্দার জীবনে ভালো-মন্দ যতো কিছুই করুক না কেন আজ তাকে উপযুক্ত মর্যাদার সাথেই যথাযোগ্য সন্মান দেখানো হচ্ছে।
জানাজার নামাজের জন্য ঈদের মাঠে অনেক পাওনাদারের বুক বিদীর্ন দীর্ঘশ্বাস-এর গরম বাতাস ছড়িয়ে পরলেও পাওনাদারদের মুখে কোন কথা নাই। পাওনাদাররা একেবারে চুপচাপ। জীবনের সেই শেষ শোকের মত সবই অং-গচ্ছামী অং-গচ্ছামী বলে মনকে মানিয়ে নিচ্ছে।
হঠাৎ মাইকে গজগম্ভির গলায় ইমাম সাহেব কাতার সোজা করার আহ্বান জানালেন। যে যেখানে ছিল সবাই কিছুটা দৌড়ে এসে কাতার বন্দী হয়ে দাঁড়িয়ে গেল। ইমাম সাহেব কিছুক্ষন দোওয়া দরুদ পরে জানাজায় শরীক হওয়া সকল মুসল্লি¬¬কেই মৃত্যুর কথা পুনরায় স্মরন করিয়ে দিলেন। ইমাম সাহেব সবাইকে সোজা পথে জীবন পরিচালনা করার ছহি ছবক দিয়ে বলে উঠলেন,হাজেরানে মুসল্লি¬গন, আমাদের জলিল ভাই কেমন লোক ছিলেন ? এক সেকেন্ডও দেরী হলো না। সবাই চিৎকার করে সমস্বরে বলে উঠলেন খুউব ভাল লোক ছিলেন তিনি। পর পর তিনবার একই সুরে সবাই চিৎকার করে বলে উঠলেন জলিল ভাই খু-উ-ব ভাল লোক ছিলেন।
উপস্থিত জানাজা কারীদের কথা শুনে হঠাৎ করেই জটা জলিলের মরা লাশের কান দুটো ঐশ্বরিক আঘাতে খরগোসের কানের মত খাড়া হয়ে উঠলো। তার পর মৃত জলিল যেন দিব্য জ্ঞানের গোপন কানে শুনতে পেলেন তার জানাজায় উপস্থিত গ্রামের সব লোকজন সমস্বরে বলছে জলিল ভাই সত্যি খু-উ-ব ভাল লোক ছিলেন। জলিল ভাইয়ের কাছে আমাদের কোন পানা-দেনা নাই। জটা জলিল খাটিয়ায় শুয়ে দিব্য জ্ঞানে গ্রামের সকল লোকের সব কথাই যেন দিব্য কানে শুনতে পাচ্ছেন। যেন সব কথা বুঝতেও পারছেন। তিনি এটাও বুঝতে পারলেন যে জীবনে ধান্ধ্যাবাজিতে আয় করা কেটি কোটি টাকার মধ্যে একটা টাকাও আজ হাতে করে নিয়ে যেতে পারলো না সে। একি ভয়ানক আফসোস !! এ কি মহা পাপে জড়িয়ে ছিলাম আমি। আজ আমি পক্ষাঘাত গ্রস্থ রুগীর মত অবসন্ন বোবা। জটা জলিলের দুই চোখ দিয়ে যেন হাজার বছরের জমে থাকা তপ্ত কান্নাশ্রু গড়িয়ে পরতে লাগলো। হায় খোদা-পরোয়ার দিগার!! গ্রামের লোক আজ একি স্বাক্ষী দিল আমার পক্ষে ? আমার গ্রামের লোকদের মুখে আজ আমি একি শুনলাম!! আমার গ্রামের লোক এত ভালো ? এত মহত ? এত উদার ? এত মহিয়ান ? এতো——–উফ্!!! ইয়া আল্লাহ রহমানির রাহিম’।হে মহান পরোয়ার দিগার আমাকে আর মাত্র কয়েকটি দিনের জন্য জীন্দেগী দাও। শুধু একটিবারের জন্য খোদা,শুধুই একটি বারের জন্য। আমি আমার গ্রামের এই সকল মহত মানুষদের পদতলে সালাম রেখে একটি বারের জন্য হৃদয়ের সকল আবেগ উজার করে দিয়ে ক্ষমা চেয়ে আসি। আর প্রাণটা ভরে একটিবার তওবা করে আসি। শুধু একটি বারের জন্য কান্নায় ভিজয়ে দিয়ে আসি গ্রামের মানুষের পুঁজনীয় ঐ সকল পদতল। শুধু একটি বার হে খোদা শুধুই একটি বার !! কত সময় অবহেলায় কাটিয়েছি খোদা,এক ওয়াক্ত নামাজ তোমার শানে পড়তে পারি নাই খোদা,শেষ বারের মত একটু তওবা করারও সুযোগ হলো না খোদা। শুধু একটিবারের জন্য আমাকে মাত্র কয়েকটা দিনের জিন্দেগী দাও মাত্র কয়েকটা দিনের জন্য !!! খোদা শুধুই একটিবারের জন্য !!!
আস্সালামু অলাইকুম ইয়া রহমতুল্লাহ-আস্সালামু অলাইকুম ইয়া রহমতুল্লাহ। জানাজা নামাজের সালাম ফেরানো শেষ। গ্রামের লোকজন অদল বদল করে কাঁধ বদলিয়ে অতি সাবধানে খাটিয়া নিয়ে যাচ্ছে রতনপুর গ্রামের শিমুল-তলা গোরস্তানের দিকে। মেঘ কেটে হাল্কা জ্যোস্নার আলোর সাথে দক্ষিনের টানা বাতাসে মিশে যাচ্ছে মহা পবিত্র কলেমা শাহাদৎ “আশ্হাদু আল্লা-ইলাহা ইল্লাললা¬-হু লা-শারীকালাহু ওয়া আশ্হাদু-আন্না মুহাম্মাদান আ’বদুহু ওয়া রাসুলুহু”।

Facebook Comments