রাজবাড়ী, ২৭শে আষাঢ়, ১৪২৭ বঙ্গাব্দ, শনিবার, ১১ জুলাই ২০২০

রম্য কথন

সত্য মিথ্যার সমাহার—–এডঃ লিয়াকত আলী বাবু

প্রকাশ: ২৯ জুন, ২০২০ ৭:৪০ : অপরাহ্ণ

রাজকন্ঠ ডেস্ক:

সেদিন ছিল রবিবার। সপ্তাহের একেবারে প্রথম দিন এবং দিন শুরুর প্রথম প্রহর। বাবা জিজ্ঞাসা করলেন-দেখতো ক’টা বাজে। আমি ঘড়ি দেখে বললাম সোয়া সাতটা। সকালের প্রথম কথাটাই মিথ্যা বলতে হলো। কারন তখন ঘড়িতে সকাল ৭টা ১৭ মিনিট হয়ে ৩০ সেকেন্ড হয়েছিল। কিন্তু আমি যদি সত্যি কথাটা বলতাম যে এখন সকাল ৭টা ১৭ মিনিট হয়ে ৩০ সেকেন্ড ? বাবা হয়তো মনে করতেন আমি ইচ্ছা করেই তার সাথে এমন একটা বেয়াদপি করছি। অগত্যা আদবের সাথেই মিথ্যা কথাটা বলতে বাধ্য হলাম। ইন্টারভিউ বোর্ড জিজ্ঞাসা করা হলো আমার জন্ম তারিখ কত ? বললাম ২৫শে আগষ্ট ১৯৫৯ সাল। আসলে কী তাই ? না ওটা ছিল একটা ডাহা একটা মিথ্যা কথা। আসলে আমার জন্ম তারিখ ৩রা সেপ্টেম্বর ১৯৫৬ সাল মোতাবেক বাংলা ১৮ই ভাদ্র রোজ সোমবার। কিন্তু আমার সার্টিফিকেটে লেখা আছে ২৫শে আগষ্ট ১৯৫৯ সাল। বলুনতো এখন কী করে বয়সের সত্যি কথাটা বলি ? আমি দীর্ঘদিন ধরে হৃদরোগে ভুগছি। কথা বললেই হাঁফিয়ে উঠি। সেদিন সকালে বুকের মাঝে বেশ চিন্ চিন্ করে ব্যাথা করতেই আস্তে আস্তে হাঁটাত হাঁটতে হাসপাতালের দিকে যাচ্ছিলাম। পথে বন্ধু কবিরের সাথে দেখা। একেবারে জীবন ঘনিষ্ট বন্ধু। কবির জিজ্ঞাসা করলো দোস্ত কেমন আছিস ? তখনও আমার বুকের মাঝে প্রচন্ড ব্যাথা করছিল। বললাম আলহামদুলিল্লাহ খুব ভাল আছি। একেবারে সাত সকালে এমন একটা ডাহা মিথ্যা কথা বলেই দ্রুত হাসপাতালের দিকে হাঁটতে শুরু করলাম। আসলে বন্ধু কবির’কে সত্য কথাটা বলতে পারলাম না কেন ? তবে আমি আমার বন্ধুর কাছে কেন যে সত্য কথাটা বলতে পালাম না তা বুঝতে নিশ্চয়ই কারো সমস্যা হওয়ার কথা নয়।
সেদিন এক জাঁদরেল নেতার সংবর্ধনা অনুষ্ঠানের অয়োজন করা হয়েছিল। স্থানীয় নেতারা আমাদের সকলের হাতে একটি করে রজনী গন্ধার ষ্টিক হাতে ধরিয়ে দিয়ে রাস্তার দু’পাশে সারিবদ্ধভ ভাবে দাঁড় করিয়ে রাখলেন। তারপর যথারীতি নেতা এসে নামলেন আমাদের সামনে। শুরু হলো শ্লোগানের পালা। মহুর্মুহু শ্লোগান। হাতে রজনী গন্ধার ষ্টিক অথচ শ্লোগান দিচ্ছি ‘বিশাল’ নেতার আগমনে লাল গোলাপ শুভেচ্ছা। সত্য কথাটা বলতে সমস্যা ছিল কোথায় ? ‘বিশাল’ নেতার আগমনে রজনী গন্ধার শুভেচ্ছা। সত্য কথাটা বললে এমন কী মহাভারত অশুদ্ধ হয়ে যেত ? তবু হাতে রজনী গন্ধার ষ্টিক নিয়ে গোলাপ ফুলের শুভেচ্ছার মিথ্যা শ্লোগান দিয়ে বাড়ী ফিরলাম।
ফুল শয্যার বাসর রাত। চক্চকে মধূ পুর্নিমার আলো জানালা দিয়ে বিছানার উপর ঢেউ খেলছে। প্রশ্ন উঠতে পারে যে বাসর রাতে জানালা খোলা রেখেছিলাম কেন তাই না ? আমাদের বাসর ঘরটা ছিল তিন তলায়। সেদিন প্রচন্ড গরমে একেবারে অস্থির হয়ে পরেছিলাম। শুধু ফ্যানের বাতাসে গরম কাটছিল না। এ জন্যেই জানালা দু’টো খোলা রেখেছিলাম। প্রথমে বাসর রাতে বধির সাজার পালা শুরু হলো। প্রথম কে কথা বলবে ? শুনেছি স্বামী ব্যাচারীকেই নাকি আগে মুখ খুলতে হয়। কারন মেয়েদের বুক ফাটে তো মুখ ফোটেনা নামক এক ধরনের অসুখ থাকে। অগত্যা আর কি করা। ধীরে ধীরে আরষ্ঠতা ভেঙ্গে একেবারে একজন আনাঢ়ি ছেলের মত বউয়ের সাথে কাঁপা কাঁপা কন্ঠে কথা বলতে শুরু করলাম। যেন ভাজা মাছটা পর্যন্তু আমি উল্টিয়ে খেতে জানি না আমি। মনে হচ্ছিল কোন অপরিচিত মেয়ের সাথে এই আমার প্রথম কথোপকথন। তার পরেও ভয় কাটছিল না। পাছে যদি ধরা পরে যাই। ধীরে ধীরে সংঁকোচ ভেঙ্গে বুলবুলি আর কাকাতোয়া কথা বলতে শুরু করে দিল। আস্তে আস্তে দু’জনেই লজ্জার ফুল কাঁটা ভেঙ্গে নিবীর ভাবে ঘনিষ্ট হয়ে যাচ্ছিলাম। ঘন্টা পার না হতেই মনে হলো হাজার বছরের চেনা এক রাজকন্যা আমার ফুল বিছানার সাথী হয়েছে। হঠাৎ কুলবধূ মৃদু হেসে দিয়ে জিজ্ঞাসা করে বসলো, ওগো আমাদের বিয়ের আগে কী কোন মেয়ের সাথে তোমার প্রেম ট্রেম হয়েছিল নাকি ? কলিজার মধ্যে একেবারে ছ্যনাৎ করে চিলিক্ দিয়ে উঠলো। হঠাৎ ভীষনভাবে চমকে উঠলাম। সর্বনাশ! নতুন বউ বলে কী ? তারপর মুহুর্তের মধ্যেই নিজেকে সহজ করে নিয়ে প্রথমে জিহ্বায় কাঁমড় খেয়ে বলে উঠলাম, আস্তাকফেরউল্লাহ ’নাআউজুবিল্লাহ! ছি! ছি! ছি! এ তুমি কী বলছো ফুলটুনি ? আল্লাহর দেওয়া এই চন্দ্রের আলোর মাঝে বসে বলছি ,এমন কী আমি দুনিয়া ছুঁয়ে পর্যন্তু কছম কেটে অতীব সততা ও নিষ্ঠার সাথেই বলতে পারি যে তুমিই আমার জীবনের প্রথম এবং জীবনের শেষ নারী। সম্ভবতঃ এটা ছিল প্রেমের পাঠশালায় আমার ১৩তম মিথ্যা কথা বলা। সুলক্ষ্মী বউটিও একেবারে কম গেল না। আমার কাঁধের উপর আস্তে করে মাথাটা এলিয়ে হাল্কা করে হেঁসে দিয়ে দৃঢ়তার সাথেই বললো, বিশ্বাস করো প্রিয়, তুমিও আমার জীবনের প্রথম পুরুষ। যদিও তার সাথে অন্তঃত তিন জন প্রেমিকের সুসম্পর্কের কথা আমার আগের থেকেই জানা আছে। ভেবেছি বয়সের কালে এমন একটু আধটু ঘটনা দুর্ঘটনা ঘটতেই পারে। তবে বৈবাহিক জীবনের সূচনা পর্বের শুভলগ্নে এমন সব স্পর্শকাতর কথা নিয়ে বেশী নাড়াচাড়া না করাই ভাল। কারন বেশী হাতাহাতিতে হাঁড়ি ভেঙ্গে গেলে দু’জনেই গুর জড়ানোর মত জড়িয়ে পরতে পারি। কারন অন্ততঃ লক্ষনদিয়া গ্রামের লাইলী আর পদ্মা পাড়ের পিছ্লা পাপিয়া’র বুক ফাটানো অভিশাপ লেগে আমার কপাল পুড়ে যাওয়ার ভয়টা মন থেকে কিছুতেই দুর করতে পারছিলাম না। এতো মাত্র দু’একজনের সাথে মেঁপে ঝুঁকে মিথ্যা কথা বলা। কিন্তু রাজনীতির মঞ্চে উঠলেতো লাখো মানুষের সামনে মিথ্যা কথার খই ফুটতে থাকে। রাজনীতির মঞ্চ মানেই মিথ্যা কথা বলার একেবারে পারফেক্ট যায়গা। রাজনীতির মঞ্চে উঠে লেবাসধারী নেতারা ইনিয়ে বিনিয়ে হাজারো মিথ্যা কথার ফুল ফোটাতে থাকে। একবারে তর-তাজা মিথ্যা কথা। রাজনীতির মঞ্চে যত মিথ্যা কথা বলা যায় তত’ই নাকি ভোটের বাক্স ফুলে ফেঁপে উঠে। মিথ্যা কথার প্রতিশ্রুতি নাই তো ভোটও নাই। মসজিদে বা মন্দিরে বসে যখন বলে আসি হে আল্ল¬াহ পাক অথবা হে পরমেশ্বর দেব,আজ থেকে আর জীবনে কোনদিনও কোন মিথ্যা কথা বলবো না। কিন্তু রাজনীতির মঞ্চে উঠলে কিছুতেই ধর্মালয়ে দেওয়া সেই প্রতিশ্রুতির কথা ঠিক রাখা যায় না।এক কথায় রাজনীতির মঞ্চে উঠা মানেই কবিরা গোনাহর পাল্লা ভারী করা।সত্য-মিথ্যায় যাই গড়া-একদিন কিন্তু পরবে ধরা। সেদিন এক বুদ্ধিজীবী বললেন যে আরে বাবা মিথ্যা কথা না থাকলে সত্য কথার মুল্য কোথায় ? কথাতো ঠিকই। যদি সত্যের পাশে মিথ্যা না থাকে তাহলে আর এ পৃথিবীতে সত্য মিথ্যার পরীক্ষা হবে কি ভাবে ? কারন নাকি খুবই সহজ। কারন খাঁটি সোনায় গয়না হয় না,খাঁটি ছানায় মিষ্টি হয় না,আর কখনোই নাকি পিউর লোক দিয়ে পলিটিক্স হয় না। সর্বশেষ সত্য-মিথ্যার সমাহার,রাজনীতির উপহার।

Facebook Comments