রাজবাড়ী, ২৭শে আষাঢ়, ১৪২৭ বঙ্গাব্দ, শনিবার, ১১ জুলাই ২০২০

প্রেমপত্র——-এড.লিয়াকত আলী বাবু

প্রকাশ: ১৬ জুন, ২০২০ ৮:১৪ : অপরাহ্ণ

রাজকন্ঠ অনলাইন নিউজ ডেস্ক:

বেশ কিছু দিন ধরে আমাদের প্রিয় বন্ধু বিল্টুর বিয়ের কথাবার্তা চলছিল। প্রথমে বিয়েতে রাজী ছিল না বিল্টু। বিয়ের ব্যাপারে প্রথম প্রথম ছেলে মেয়েরা যা যা বলে থাকে আর কি। বয়স হয় নাই। আরেকটু দাঁড়িয়ে নেই। এই সব কথাবার্তা। এসব কথাতো আর তাদের মনের কথা না। লোক দেখানো ভনিতা। সর্বশেষ বিল্টু তাঁর বিয়ের ব্যাপারে মত দিয়ে একটা মাত্র ছোট আব্দার করে বসলো। আব্দারটা হলো, তাঁর একটা হায়ার কাষ্টের আন্টাষ্ট ষোড়ষী সুন্দরী মেয়ে চাই। এ শুধু কথার কথা নয়। একেবারেই একটা ‘অধরা’ মেয়ে চাই তাঁর। বিল্টুর দাবীকে প্রাধান্য দিয়েই পাত্রী খোঁজ করা হচ্ছিল। বিল্টুর আব্দার রক্ষা করার জন্য বেশ কিছু সময়ও পার হয়ে গেল। বিল্টুর ছোট আব্দারটির সাথে মিল রেখে বলাচলে একেবারে কষ্টি পাথরে যাচাই বাছাই করে হায়ার কাষ্টের একটা একেবারে আনকোরা আন্টাষ্ট ষোড়ষী সুন্দরী মেয়ের অনুসন্ধান চলছিল। ভাগ্য সুপ্রসন্ন। অবশেষে ভাগ্যক্রমে একেবারে আন্টাষ্ট ষোড়ষী সুন্দরী একটা মেয়ে মিলেও গেল। তবে বড়ই কষ্ট হলো বটে। পাত্রীর নাম মিস মহুয়া খাতুন। সংক্ষেপে মিস মহুয়া। পাঁচ ফুট পাঁচ ইঞ্চির একটু বেশী লম্বা। হাল্কা পাতলা গরন। একেবারে স্লিম ফিগার। গায়ের রং হাল্কা সাদাটে ফর্সা। যাকে বলে অফ হোয়াইট। সরু দু’টি ধনুক মার্কা ভ্রু। চমৎকার চারুকলা সজ্জিত জল প্রপাতের ধারা বয়ে চলার মত হাঁটু পর্যন্তু চুল। চোখ দুটি যেন বায়োস্কোপের খোলা জানালা। হাসলে দাঁত গুলো মুক্তার মত ঝিলিক দিয়ে উঠে। আর হাসি ভরা থাকে আবীর রাঙা ঠোঁটে। অন্যভাবে বললে বলতে হয় যে এ যেন শ্রষ্টার অপুর্ব সৃষ্টি। বিয়ের আলোচনা শুরুর খুব অল্প সময়ের মধ্যেই বিয়ের দিনক্ষনও একেবারে পাকা হয়ে গেল। সিদ্ধান্ত হলো বিয়ের আগে বিল্টুর হবু স্ত্রীর হাতে একটি ছোট্ট মুক্তা বসানো স্বর্নের আংটি পরানো হবে। ইংরেজীতে যাকে বলে এ্যাঙ্গেজমেন্ট। কথা মত যথা সময়ে আমাদের বন্ধু বিল্টুর সাথে মিস মহুরার,নাও সি ইজ মিসেস মহুয়ার আংটি পরানোর অনুষ্ঠানিক পর্ব অর্থাৎ এ্যাঙ্গেজমেন্টের আনান্দ ঘন আনুষ্ঠানিকতা শেষ হয়ে গেল। ছেট খাটো হলেও দেখার মত একটা দৃষ্টি নন্দন অনুষ্ঠান। এ্যাঙ্গেজমেন্টের এক মাস পর ২৯‘শে জুন বিয়ের তারিখটাও ঠিক করে ফেলা হলো। বিয়ে হবে রাতের বেলা। সময় বাদ এশা। সারা রাত ধরে বিয়ের রকমারী সব অনুষ্ঠান চলবে। শহর থেকে শিল্পী এনে গান বাজনার ব্যাবস্থাও করা হবে। অনুষ্ঠানের ব্যাপকতা বেশ বড়। বিল্টুর বিয়ের আয়োজন নিয়ে যখন পরিবারের সবাই হৈ-হুল্লে-ার করে ব্যস্ত সময় কাটাচ্ছে তখনই হোঁচট খাওয়ার মত একটা জট পাকানো ঘটনা ঘটে গেল। এ্যাঙ্গেজমেন্টের ঠিক সাতদিন পরের ঘটনা। শুক্রবার জুম্মার দিন। মিসেস মহুয়া খুব গোপনে বিল্টুর কাছে বিবাহ পুর্ববর্তী হলুদ খামে একখানা প্রেম পত্র পাঠিয়েছে। প্রেম পত্রটিতে তীব্র ঘ্রান যুক্ত পাউডার মেশানো। সম্ভবতঃ বিদেশী পউডার। মহুয়ার এক মামা বহু দিন ধরে বিদেশে থাকে। চিঠির সাথে ছিল দ’ুটি ফুলের ডালে দুটো পাখীর ছবি সম্বলিত একটি লাল-সবুজ রঙ মেশানো রুমাল। পাখী দুটির একটির ডানায় লাল সুতোয় লেখা বিল্টু এবং অপর পাখীটির ডানায় সবুজ সুতোও লেখা মহুয়া। মহুয়ার পাঠানো চিঠি বা রুমালের মধ্যে কোন সমস্যা ছিল না। সমস্যা হলো চিঠির প্রথম লাইনটি নিয়ে। পত্রের প্রথম লাইনটি ছিল এরকম।“প্রিয়তম ‘বি’,কোন পুরুষের কাছে লেখা এটাই আমার জীবনের প্রথম পত্র”। মহুয়া কেন যে এমন একটি অতি মাত্রার সন্দেহ যুক্ত কথা দিয়ে চিঠি লেখা শুরু করেছে তার একটা মনোস্তাত্বিক ব্যাখ্যা দরকার হয়ে পরলো। তার কাছে নিশ্চই বিল্টু জানতে চায় নাই যে কোন পুরুষের কাছে লেখা এটাই তার প্রথম পত্র,না কি দ্বিতীয় পত্র। এদিকে মহুয়ার পাউডার মাখানো প্রেম পত্র পেয়ে বিল্টুতো মহা খুশি। যাকে বলে খুশিতে একেবারে বাগ বাগ। চিঠি পেয়ে জুম্মার নামাজের পর দুই রাকাত নফল নামাজ পড়ে নিল বিল্টু। তারপর বিল্টু আত্ম তৃপ্তিতে টই টুম্বুর হয়ে বুক ফুলিয়ে তার হবু বধুর পত্রখানা তার বন্ধুদের কাছে দেখাতে নিয়ে এলো। বিল্টুর খুশি রাখার যেন জায়গা নাই। তারপর মুখের সব কয়টি দাঁত বের করে ফিক করে হেসে দিয়ে বললো ‘সত্যি দোস্ত এবার বুঝলাম আসলেই আমার কপাল খুব ভাল। মহুয়া তার এতটুকুন জীবনে কোন পুরুষের ছোঁয়া পাওয়াতো দুরের কথা কোন পুরুষের সাথে তার কোন দিন একটি কথা পর্যন্ত হয় নাই’। বিল্টুর ভাব খানা এমন যে তার ভাবী বধু মহুয়া যে একবিংশ শতাব্দিতে এসেও একেবারে আনকোড়া আন্টাষ্ট মেয়ে হিসাবে নিজেকে রক্ষা করতে পেরেছে সেটা গর্ব করার মতই একটা বিষয়। মিস মহুয়া বাংলাদেশের আধুনিক ইভটিজিং মার্কা সমাজের হাজারো হাতাহাতির মধ্যে নিজেকে রক্ষা করে রাখতে পেরেছে এমন একটা লিখিত প্রমান এখন বিল্টুর একেবারে হাতের মুঠোয়। কিন্তু প্রেমের অতীত ইতিহাসতো তা বলে না। প্রেমের ইতিহাসতো অন্য কথা বলে। জীবনে কোনদিন প্রেমপত্র লেখেন নাই বা প্রেমপত্র পাওয়ার কোন আকাঁঙ্খা ছিল না এমন কোন শিক্ষিত নারী-পুরুষের খোঁজ এ পৃথিবীতে পাওয়া যাবে কিনা সন্দেহ আছে। তবে যদি কোন ছেলে মেয়ের বিয়ের পর কোন ভাবে একটু প্রকাশ পায় যে তারা বিয়ের আগে ভুলবশতঃ দ’ুএকখানা প্রেমপত্র লিখেছিলেন বা পেয়েছিলেন তাহলেই সর্বনাশ। আর সে কারনেই সকল প্রেমিক-প্রেমিকারা তাদের বিয়ের পর পৃথিবী ছুঁয়ে কছম কাটতেও রাজী তবু অতীতের কোন কিছুই তারা স্বীকার করতে চায় না। এক কথায় যে কোন ছেলে মেয়ের বিয়ের পর প্রেম পত্র দেওয়া নেওয়ার ব্যাপারে প্রকাশ্য স্বীকারোক্তি করা মানেই বাঙালী সমাজে চরিত্রহীন বলেই গন্য হওয়ার মত একটা কঠিন বিষয়। আমরা বন্ধুরা মিলে বিল্টুকে প্রেমের তাত্ত্বিক সকল বিষয় ও এ পৃথিবীতে প্রেমের গোপন আকর্ষন ও প্রেমের আদি মৌলিক দর্শন সম্পর্কে আদ্যপান্ত সব কিছুই বুঝিয়ে বললাম। মহুয়ার পাঠানো চিঠির মধ্যে পাউডারের ঘ্রানের চাইতে এখন সন্দেহের ঘ্রানই বেশী করে প্রকাশ পেতে লাগলো। সন্দেহের সমাধান হওয়া খুবই জরুরী। এ আর কিছু না। রীতিমত জীবন নিয়ে খেলা। এ কারনেই জরুরী ভিত্তিতে বন্ধুদের মাঝ থেকে তৎক্ষনাত তিন সদস্য বিশিষ্ট একটি হাই পাওয়ারের ইনকোয়ারী কমিটি গঠন করে ফেলা হলো । ইনকোয়ারী কমিটি অতি গোপনে এবং প্রয়োজনে আন্ডারগ্রাউন্ডে নেমে গিয়ে চুল চেরা তদন্ত পুর্বক ৭ দিনের মধ্যে রিপোর্ট দেবে যে মহুয়ার পাঠানো প্রেম পত্রের প্রথম লাইনের বিষয়টি আদৌ সঠিক কিনা। শুরু হলো মহুয়ার পাঠানো প্রেমপত্রের প্রথম লাইনের তদন্ত কাজ। তদন্ত কমিটি খেয়ে না খেয়ে কঠিন কসরত করে তদন্ত কাজ চালিয়ে যেতে লাগলো। অবশেষে ৭ দিনের আগেই অর্থাৎ ৫ দিনের মাথায় মহুয়ার প্রেম পত্রের প্রথম লাইনের সকল ইত্তে–ফাক হয়ে গেল। বিল্টুর সাথে মহুয়ার এ্যাঙ্গেজমেন্ট হওয়ার আগেই মহুয়া তিন তিনটি গোপন প্রেমে জড়িত হওয়ার লিখিত প্রমান এখন তদন্ত কমিটির হাতের মুঁঠোয়। মহুয়া নিজের হাতে তার তিনজন অতীত প্রেমিকের কাছে কত খানা প্রেম পত্র লিখেছিল তার সঠিক কোন সন্ধান পাওয়া না গেলেও প্রায় এক ডজন প্রেম পত্র তদন্ত কমিটির হস্তগত হয়েছে। তদন্ত কমিটির হাতে উদ্ধার হওয়া এক ডজন প্রেম পত্র এখন পর্যাবেক্ষনের জন্য গোপন স্থানে সংরক্ষন করে রাখা হয়েছে। সংরক্ষিত ঐ এক ডজন প্রেম পত্রের মধ্যে তিনটি প্রেমপত্রের ভাব সম্প্রসারন বড়ই বিপদ জনক। মহুয়া তার নিজের হাতে গ্রামের গ্যাঁদা চাচার ছেলে মজনুর কাছে যে প্রেমপত্র খানা লিখেছিল তার তিন নাম্বার লাইনটি ছিল এমন “ভালবাসার বিরুদ্ধাচরনের কারনে এ পৃথিবীর সমস্ত পাহাড় পর্বত গলিয়া সমতল হইয়া যাইতে পারে, খাল বিল,নদী নালা, সাগর মহা সাগর সব শুকাইয়া মরুভূমি হইয়া যাইতে পারে, পুর্বের সুর্য পশ্চিমে উদয় হইতে পারে,এমন কি ২০/২৫ মাত্রার ভুমি কম্পে সমগ্র পৃথিবী উল্টাইয়া যাইতে পারে, কিন্তু তোমার আমার ভালবাসা বিন্দু পরিমানও চিড় ধরিবে না”। ঐ প্রেম পত্রের চার নাম্বার লাইনটি ছিল আরও চমকপ্রদ। চার নাম্বার লাইনে লেখা ছিল “প্রিয়তম-অতি আদরের মজনু ঃ আমার কলিজা চিপিয়া দেওয়া সব টুকু ভালবাসা আমার রঙিন আঁচলে তুলিয়া তোমার হৃদয়ে ঢালিয়া দিলাম। আজ আমি (মহুয়া) ভোরের সুর্যকে স্বাক্ষী রাখিয়া গলা পানিতে ভরা কলস কাঁখে নিয়া প্রতিজ্ঞা করিয়াছি। প্রয়োজনে গলায় কলসী ঝুলাইয়া জলে ডুবিয়া আত্মহত্যা করিয়া অভূক্ত প্রেমের প্রায়শ্চিত্ত করিব, তবু এই হাত দিয়া জীবনে অন্য কাহারো গলায় মালা পরাইতে পারিব না”। লক্ষিèটি, এ কথা মনে রাখিও যে এ প্রতিজ্ঞা শুধুই আমার আলগা পাগলামী নয়। এটা আমার শিল-পাটার মত কঠিন শক্ত একটা প্রতিশ্রতি। তদন্ত রিপোর্ট অনুযায়ী মহুয়া তার ১২ নাম্বার প্রেম পত্রটি লিখেছিল উত্তর পাড়ার ফজের মাতুব্বরের ছেলে ফটিক চাঁদের কাছে। পত্রের প্রথম লাইনটি ছিল এমন। “কলিজার টুকরা সোনার চাঁদ ফটিক আমার- আজ আমি আগুন ঝরা ভরা চৈত্র মাসেও বসন্তের গভীর উন্মাদনা মিশ্রিত রস উৎলানো ভালবাসা অনুভব করিতেছি। আর তাইতো বসন্তের অস্তগামী সুর্যের আবির রঙের সাথে আমার কচি মনের মাধুরী মিশিয়ে তোমার কাছে জীবনের এই প্রথম প্রেম পত্রটি লিখিতে বসিয়াছি”। স্মরন রাখিও যে কোন পুরুষের কাছে লেখা এটাই আমার জীবনের প্রথম প্রেমপত্র। তাই লজ্জায় আমার কলমের নিব বাঁকা হইয়া যাইতেছে বলিয়া হাতের লেখা ভালো হইল না। হাতের লেখা যেমনই হোক না কেন তোমার প্রতি আমার ভালোবাসার এক বিন্দু পরিমানও কমতি হইবে না। কারন আমার জীবনের সব টুকু ভালোবাসাই আজ আমি তোমার পদ্মযুগল চরনতলে সপিঁয়া দিয়াছি। আজ তোমাকে কি দিয়া বোঝাইব ? আজ আমার কাছে অবশিষ্ট আর কোন ভালবাসাই নাই। তদন্ত প্রতিবেদনের প্রমান পত্র অনুযায়ী মহুয়ার তিন নাম্বার প্রেমিক ‘ফরেন ফরিদের’ লেখা প্রেম পত্র খানা দেখে বিল্টুর হার্টবিট মিনিটে ১১০-এর ঘরে উঠে গেল। মহুয়ার নিকট ফরেন ফরিদের লেখা বেশ কয়েকটি প্রেম পত্র দেখে বিল্টুর চোখ তাজা সরিষা ফুলের ঝাপসায় অবছা হয়ে যাওয়ার মত অবস্থা। আজ সে এগুলো কি দেখছে ? তার চোখের সামনে এগুলো কি ? এতো দেখছি মহুয়ার কাছে লেখা তারই হাতের লেখা চিঠি! ‘ফরেন ফরিদ’ বিল্টুর ছোট বেলার জানের জান দোস্ত। ফরেন ফরিদ বেশীদুর লেখাপড়া করতে পারে নাই। বহুদিন বিদেশে কাটানোর জন্য ফরিদের নাম এখন ‘ফরেন ফরিদ’। সবাই এখন তাকে ফরেন ফরিদ হিসাবেই চেনে। ফরেন ফরিদ ফরেন থেকে ফিরে এসে তার প্রিয়তমা প্রেমিকার কাছে চিঠি লেখার জন্য বন্ধু বিল্টুর সাহায্য নিত। বিল্টুর হাতের লেখা খুব সুন্দর। ফরেন ফরিদ তার প্রেমিকার ছদ্মনাম রেখেছিল ময়ুরী। বিল্টু ময়ুরীর নামে ফরেন ফরিদের হয়ে বহু প্রেমপত্র লিখে দিয়ে ফরেন ফরিদের সাথে শক্ত করে বন্ধুত্বের বেড়া বেঁধেছিল। আজ সে এ গুলো কি দেখছে ? হায় কপাল ! সে এতদিন ধরে নিজের পায়ে নিজেই কুড়াল মেরে আসছিল। এখন দেখা যাচ্ছে তার হবু বধু মহুয়ারই ছদ্মনাম ময়ুরী। ছি! ফরেন ফরিদের হয়ে যে সকল নষ্ট ভাষায় সে মযুরীর বরাবরে চিঠি লিখেছিল তা সভ্য সমাজে পড়তে হলে মাঝে মধ্যেই দুই/চার লাইন করে বাদ দিয়ে পড়তে হবে। কিন্তু ফরেন ফরিদের কাছে মহুয়া ওরফে ময়ুরী যা লিখতো তা পড়লে রীতিমত কবিরা গোনা হওয়ার মত অবস্থা। বিল্টুতো ময়ুরীর লেখা চিঠি পড়েই ফরেন ফরিদের চিঠির উত্তর লিখে দিত। ছি ! ছি ! ছি ! ময়ুরীর সে লেখা চিঠিতো কোন স্বাভাবিক লোকের পড়ার মত চিঠি ছিল না। হায় ! এখন কি হবে ? এত দামী হীরার আংটি পরানো হয়ে গেছে। হীরার আংটি হারানো আর হায়াতে জিন্দেগী হারানোতো প্রায় এক কথা। হায় মহা আফসোস ! কলিজায় আজ বিঁধে গেল শৈল মারা কোঁচ। এত কিছুর পরেও সকলের বেসুমার চাপচাপিতে অবশেষে যথা সময়েই বিল্টু-মহুয়ার বিয়েটা হয়ে গেল। বিয়ের পর মহুয়া বিল্টুর গরম মাথাটা তার নরম কোলের উপর রেখে বোঝাতে সক্ষম হলো যে, যে যত প্রেম পত্র লিখতে পারে তার হাতের লেখা তত সুন্দর হয়। এখনকার ছেলে-মেয়েদের এই জন্যেইতো হাতের লেখা ভালো না। দেখনা ডাক্তাররা প্রেম করতে পারে না দেখে তাদের হাতের লেখার অবস্থাটা কি। কোন ডাক্তার প্রেম ট্রেম করেছে এমন কথা কি কোথায়ও শুনেছ নাকি ? অবশ্যই শোন নাই। প্রেমপত্র লেখাতো একটা এ্যাবাষ্ট্রাক্ট আর্ট। যাকে বলে হস্ত লেখা শিল্পকলা। আবার অন্য কথায় বলা হয়, প্রেমপত্র মানেইতো আধুনিক কবিতা। আর প্রেমপত্রের সাথে পাঠানো হাতে বোনানো ফুল তোলা রুমাল ? সেতো রীতিমত আধুনিক ট্যাপেষ্ট্রি আর্ট। সারা বিশ্বে যার আলাদা একটা কদর রয়েছে। মহুয়ার কোলে মাথা রেখে বিল্টুও মনে মনে ভাবে যে তার হাতের লেখাওতো আর এমনিতেই এত সুন্দর হয় নাই। কম পক্ষে তিন/চার শত খাতার পাতা সে প্রেম পত্রের পেছনে খরচ করে তবেই কি না তার হাতের লেখা সুন্দর করতে পেরেছে। আজ তার অতীত প্রেমিকা পিছলা পাপিয়ার কথা খুব বেশী করে মনে পরছে। বিল্টু আজ মহুয়ার কোলে মাথা রেখেও পিছলা পাপিয়ার কাছে লেখা পেম পত্রের পয়ার গুলো মনে করার চেষ্টা করছে। বিল্টু পিছলা পাপিয়ার কাছে তার শেষ প্রেম পত্রে লিখেছিল—–।
“তুমি ছিলে আর ছিল স্বপ্নিল ঘুম,
তুমি ছিলে অধরেতে খেয়েছিনু চুম-
আজ তুমি নেই স্বপ্নিল ঘুম নেই চোখে ,
আজ তুমি নেই সিগারেটে চুমু খাই শোকে।ু
ওদিকে মহুয়াও বিল্টুর গোল পাকানো মাথাটা নিজের কোলের উপর রেখে আজ তার প্রেমিকা মজনু,ফটিক চাঁদ এবং ফরেন ফরিদের কাছে লেখা প্রেম পত্রের কাব্যিক কথাগুলো স্মরন করার চেষ্টা করছিল। আহ একেবারে সুবল সাহার রসগে¬াল্ল¬ার মত রস জড়ানো ভালবাসার কত কথাই না ওদের কাছে পাঠানো প্রেম পত্রে লিখেছিলাম। মহুয়া বিল্টুর মাথাটা তার কোলের মধ্যে দু’হাত দিয়ে চেপে ধরে বলতে থাকে ‘আহা তোমাকে পাব বলে কত বিনিন্দ্র রজনী না খেয়ে কাটিয়ে দিয়েছি’ আমি। না খেয়ে রাত কাটিয়োছো কেন ? তোমার কথা মনে পরলে আর কিছুইে খেতে ইচ্ছে করতো না। আমার কথা তুমি ভাবতে কেন ? আমার সাথেতো আর তোমার কোন প্রেম ছিল না। যাহ্ ! কি যে বলো না তুমি। তোমাকে পাবার জন্য কত জনের সাথে যে আমাকে প্রেমের অভিনয় করতে হয়েছে তার কি কোন ইয়াত্তা ছিল। শোনো প্রিয়,প্রেম হলো স্বর্গীয় ভাবে তালিকা করা এটা অতিশয় জটিল বিষয়। ঐ তালিকায় যার সাথে যার জুটি বাঁধার জন্য লগিং করা আছে তার সাথেই তার জুটি মিলতে হবে। নিজেদের শুধু পাসওয়াডর্টা সংযোগ করে দেওয়া মাত্র। এ সবই একেবারে স্বর্গের সিষ্টেম করা জিনিষ। মাঝখানে শুধু আসল-নকল প্রেম পরীক্ষার টাল্টি-বাল্টি মাত্র। এতে তোমার আর আমার কোনই দোষ ছিল না। স্বর্গে যে ভাবে আমাদের প্রোফাইলে ইনষ্টল দেওয়া ছিল ঠিক সেই ভাবেই আমাদেরকে চলতে হয়েছে। আমাদের স্বর্গের ফাইলে এ ভাবে ইনষ্টল দেওয়া ছিল যে আমি আর তুমি বিভিন্ন জনের সাথে মিথ্যা প্রেমের সফটঅয়ারে ঘুরপাক খেতে খেতে অবশেষে তুমি আর আমি এক বিছানার ফুল শয্যায় গিয়ে সাথী হবো। সফটঅয়ারে ইনষ্টল দেওয়া কোন কাজে আমাদের কি কোন হাত ছিল ? না আমাদের কোনই হাত ছিল না। এ ই কথা বলে মহুয়া বিল্টুর মাথাটা তার বুকের মাঝে জাপটে ধরলো। এই বয়ানে বিল্টটুও স্বস্থির নিঃশ্বাস ফেলে মহুয়ার বুকের মাঝে মাথা গুঁজে দিয়ে ধীরে ধীরে অতীত ভুলে যেতে লাগলো আর মনে মনে ভাবতে লাগলো হায়রে বিবাহের যোগসূত্র হায়রে সাধের প্রেমপত্র!!!

Facebook Comments