রাজবাড়ী, ২৬শে আষাঢ়, ১৪২৭ বঙ্গাব্দ, শুক্রবার, ১০ জুলাই ২০২০

ঈদ মোবারক———এডভোকেট লিয়াকত আলী বাবু

প্রকাশ: ২৪ মে, ২০২০ ৭:৫৪ : অপরাহ্ণ

’হোটেল শাহজাহান’। নামটা বেশ বড়। কিন্তু হোটেলটা অনেক ছোট। দুপুর গড়িয়ে বিকেল নেমে আসছে। হোটেলের চার পাশটা তখনও লাল কাপড় দিয়ে ঘেরা। মনে হচ্ছে বন্দিদশা। রহমত শাহ’র দম বন্ধ হয়ে আসছে। নাম রহমত আলী শেখ। এখন নাম রেখেছে রহমত শাহ। পেশা কবিরাজী, হস্তরেখা দেখে পাথর বেচা এবং ইদানিং পীরগিরি লাইনে দাখিল হয়ে ঝাড় ফুঁক দিয়ে যাচ্ছেন। পাশে দালাল দবির আলী টেবিলের উপর ঠেকনা দিয়ে বাম হাতের তালুর উপর শুকনো মুখ খানা ঠেকিয়ে রেখে মিষ্টি ভরা আলমারীর দিকে তাকিয়ে আছে। আলমারী ভরা হরেক রকমের মিষ্টির ডালা সাজানো। পল্লী কবির ভাষায় হাত বাড়ালেই মুঠি ভরি সেই ক্ষনে’র মত অবস্থা। কিন্তু পকেট একদম ফাঁকা। ইচ্ছে করলেই হাত বাড়ানো যাচ্ছে না। ওদিকে ওন্তাাদ রহমত শাহ’র অবস্থাও ভাল না। দু’দিন হতে চললো কোন মক্কেলের দেখা নাই। এ ভাবে কি আর জীবন চলে ? পরের হাতে পাথর লাগিয়ে কত মানুষের ভাগ্য বদল করে দিয়েছে, কিন্তু নিজেদের ভাগ্যের কোনই পরিবর্তন হচ্ছে না। রহমত শাহ’র নিজেরও পাথরের উপর কোন বিশ্বাস নাই। বিশ্বাস শুধু সহজ সরল লোকজন এ যুগেও ভাগ্য পরিবর্তনের জন্য পাথর কিনতে চায় এই বিষয়টার উপর। এখানও পাথরে ভাগ্য বদলের একটা নিরেট বিশ্বাস জেগে আছে মানুষের মনের গভীরে। লাল কাপড় উঁচু করে দুইজন ভদ্রলোক দোকানের মধ্যে ঢুকলো। নিশ্চয়ই লোক দু’জন রোজা নাই। দবিরের চোখ সজাগ হয়ে উঠেছে। ওস্তাদ রহমত শাহ চোখ বুঁেজ বুঁদ হয়ে বসে আছে। বড় বড় চুল আর সারা মুখ ভরা দাড়ি-গোঁপে রহমত শাহ’র ক্ষুধৃর্ত মুখখানা দেখা যাচ্ছে না। সারাদিন পর একটা শিকার পাওয়া গেছে। এবার কাজ বানাবে দবির। লোক দ’ুজন দবিরের পাশের টেবিলে বসে দু’কাপ চিনি ছাড়া চায়ের অর্ডার দিল। শুধু চা ? তাও আবার চিনি ছাড়া ? নাহ্ খুব একটা ভাল পার্টি না। এর পরেও দবিরের চোখ ধীরে ধীরে বড় হয়ে আসতে থাকে। দবিরের চোখ হঠাৎ করে জ¦লে উঠে। দবির মনে মনে ভাবে,পেয়ে গেছি পেয়ে গেছি। দ’ুজনেরই ডায়াবেটিস আছে। এই ডায়াবেটিস রোগ দিয়েই শুরু করা যায়। কিন্তু পর ক্ষনেই মনটা আবার একটু খারাপ হয়ে যায় দবিরের। কারন ওস্তাদ বলেছে যে, যে সকল অসুখের ঔষধ আবিস্কার হয়ে গেছে সেই সকল অসুখের কোন তাবিজ ক্ববজ হয় না। যেমন জ্বরের কোন তাবিজ নাই। কিন্তু হাঁপানী রোগের ভুরি ভুরি তাবিজ বিক্রি হয়। ডায়বেটিসের এখন ঔষধ আবিস্কার হয়েছে। তবে রক্ষে একটাই। আর সেটা হলো ডায়াবেটিস একেবারে নিরাময়যোগ্য রোগ না। নিয়ন্ত্রনযোগ্য। নিরাময়ের জন্য একটু ফাঁক আছে। ঐ ফাঁক দিয়ে ঢুকে পরা যায়। রহমত শাহ্ চোখ বন্ধ করে কান খাড়া করে রেখেছে দবিরের কন্ঠের দিকে। দবিরটা অতটা চালাক চতুর না। এ ব্যবসায় ধাপ্পাবাজীতে বড়ই চৌকষ হতে হয়। দবিরের গলার আওয়াজ পাওয়া যাচ্ছে না। রহমত হাল্কা করে চোখের পাতা এড়িয়ে দবিরকে দেখে নেয়। রহমতের মাথা ভরা চুল আর মুখ ভরা আধো পাকা দাড়ি-গোঁপে বেশ দশাসই দরবেশই মনে হচ্ছে। গোঁপের কারনে মুখগহ্বর দেখো যায় না। ঝাকড়া চুলের জট পাকানো দীর্ঘতা চোখে পরার মত। আদি সৈয়দশাহী পীর কেবলা মার্কা ধাঁচ আছে। কিন্তু দবির হারামজাদাটা শুরু করছে না কেন ? শুধু চা খাওয়া। খুব একটা বেশী সময় লাগবে না। উঠে গেলে সারা দিনের শিকার হাত ছাড়া হয়ে যাবে। রহমতের কান খাড়া করে রাখা আছে। আগামী কাল ঈদ। অন্ততঃ চিনি সেমাইয়ের একটা ব্যাবস্থা না করলেই না। রোজা রাখা হয় নাই সে এক পাপ। নামাজ পড়া হয় নাই সেটাও আরেক ধাপ পাপ। এবার মানুষ ঠকাবো ! ঝাড়াঝাড় ধাপ্পাবাজী। এখন আর পাপ পুন্যের কোন বাদ বিচার করা যাবে না। এ শিকার ছুটে গেলে সারাদিনের অপেক্ষাটাই একেবারে মাটি হয়ে যাবে। আসলে দবিরটাকে দিয়ে এ কাজ হয় না। হারামজাদা শুরটাই করতে পারছে না। ভদ্রলোক দুজনেই সিগারেট ধরিয়েছে। সিগারেট শেষ হলেই বেড়িয়ে পরবে। রোজার জন্য লুকিয়ে লুকিয়ে সিগারেট খাচ্ছে। ভাইজানরা চিনি ছাড়া চা খাইলেন ক্যান ? দবিরের কন্ঠ শোনা গেল। রহমত চোখ বন্ধ করে ফেলে। লোক দু’জন কিছুটা চমকে উঠলেন মনে হলো। আমাদেরকে কিছু জিজ্ঞাসা করছেন ভাই ? একজন জানতে চাইলো। জী আপনাগোরে কথাই কতিছি। ও তাই ? ভাই আমাদের হাই ডায়বেটিস। ডায়াবেটিসের মাত্রা প্রায় সময়ই বিশ বাইশ থাকে। তাই চিনি ছাড়া চা খাই। তাহলি আপনারা সিগারেট খাতিছেন কি জন্যি ? ডায়াবেটিসের মধ্যি সিগারেট খালিতো আরও ক্ষতি হয়া যায়। আরে ভাই নেশা নেশা। খুব বড় নেশা। সিগারেট ছাড়তে পারতিছিনে। ইচ্ছে করলিই কিন্তু সিগারেট ছাড়ে দিওয়া যায়। কিন্তু মনের বড়ই একটা জোর লাগে। তয় ডায়াবেটিসের কিন্তু স্বপ্নে পাওয়া একটা গাছ আছে। পরপর সাত দিন মাগরিবির ওক্তে কুসুরের গুড় দিয়ে খাতি হয়। ঐ যে পাগল বসে আছে না ? ঐ শালার পাগল সবই জানে। শালার পাগল সহজে কতা বলতি চায় না। একটু শক্ত করে ধরা লাগে। এই কথা বলে দবির রহমত শাহ’র দিকে ইঙ্গিত করে দেয়। রহমতের চোখ বন্ধ। চেহারার মধ্যে বুজুর্গী ভাব ফুটে উঠেছে। কিন্তু লোক দুইজন খুব একটা আগ্রহ না দেখিয়ে দোকানদারকে আরো দু কাপ চা দিতে বললো। ইস্ হাতের মুঠোর মধ্যি থেকে শিকার বেড়িয়ে যাচ্ছে বুঝি। আর মাত্র দু কাপ চা’ খাতি যতক্ষন। বড় জোড় দুটো সিগারেট। মনে হচ্ছে পকেটে মাল আছে। মাল মানে টাকা। বড় লোক বলেই মনে হচ্ছে। বড়লোকদের টাকা খসালে খুব একটা পাপ হওয়ার কথা না। ঈদের বাজার। এত সব পাপ পুন্যির কথা চিন্তা করতি নাই। ডায়াবেটিসের দাওয়াইয়ের কথায় কাজ হলো বলে মনে হতিছে না। রহমত শাহ’র মাথার মধ্যে শয়তানি ঘুরপাক খাচ্ছে। হে পরাক্রম শালী শয়তান,শয়তানিতে একটু সাহায্য করা যায় না ? আল্লাাহর কাছে অকাম করার জন্য দোয়া চাওয়া উচিত না। আর আল্লাহ পাক অকাম করার দোয়া মঞ্জুর করবি কি জন্যি ? তাহলি কি আর ধর্ম বলে কিছু থাকে ? কালকে ঈদ না হলি শয়তানের কাছে কোন সাহায্যই চাওয়ার দরকার ছিল না। একেবারে সন্ধ্যা হয়ে আসতিছে। কিন্তু কামের কাম হতিছে না। হঠাৎ মেঘ ডাকার আওয়াজ শুনে সামনের জন পেছনের জনকে বললো চল রশিদ বৃষ্টি আসতে পারে। তাড়াতাড়ি উঠে পরি। রশিদ !! তাহলি পেছনের জনের নাম রশিদ ? যাহা বায়ান্নো তাহাই চোষট্টি। এই ব্যাটা রশিদ, একটু এদিকে আয়। ভারী কন্ঠের ডাক শুনে রশিদ একটু ঘাবরে যায়। ভয়ানক ব্যাপার !! পাগল নাম জানলো কি ভাবে ? তাহলেতা ভীতরে বস্তু আছে। এতো হাল্কা পাতলা পাগল না। রশিদ আস্তে করে উঠে গিয়ে রহমতের পাশে গিয়ে বসে পরে। সাথে কবিরও যায়। সাথের বন্ধুটির নাম কবির। রশিদ বললো বাবা আমাকে কি কিছু বলবেন ? রহমত শাহ মাথা নেড়ে বুঝালো না কিছুই বলবে না। রশিদের আগ্রহ আরও বেড়ে গেল। বাবা দয়া করে কি কিছু খাবেন ? দয়া করে খাবো ?? ব্যাটা বলে কি ? আহা সারদিনে মাত্র দুটো সিঙ্গারা থেয়ে বসে আছে রহমত ওরফে রহমত শাহ। রশিদ কি না বলে দয়া করে খাবে কি না ? এখনতো পৃথিবীর সমস্ত ক্ষুধা রহমতের পেটের মধ্যে হাহাকার করছে। পেটতো এখন একটা জ¦লন্ত আগ্নেয়গীরি।সত্যিকার অর্থেই রহমত শাহে’র পেট এখন একটা জ্বলন্ত আগ্নেয়গিরী। পেট নামক ঐ জ¦লন্ত আগ্নেয়গীরির মধ্যে এখন যা দেবে সবই এক নিমেশে জ্বলে পুড়ে ছাড় খাড় হয়ে যাবে। তার পরেও রহমত শাহ এক সাগর ক্ষুধা পেটে রেখে মাথা নেড়ে সিগন্যাল দেয়, না সে কিছুই খাবে না। রশিদ আর একটু নড়েচড়ে বসে। ব্যাটা শক্ত পাগলই বটে। এদিকে রহমতের চোখ চলে যায় রশিদের অনামিকা আঙ্গলে থাকা সোনার আংটির দিকে। আহা নির্ঘাত দেড় দুই আনা ওজনের হবে। চার পাঁচ হাজার টাকার একটা মওকা। উফ্ কি ভাবে কাজটা করা যায় ? ঐ টাকা হলে এখনি সোজা বাজারে গিয়ে ফাতুর মা’র জন্য একটা টাঙ্গাইলের শাড়ী কিনে ফেলতে পারবে। ফাতু আর ছেলে রাসেলের জন্য নতুন জামা জুতা। নিজের জন্য একটা নতুন লুঙ্গি আর পাঞ্জাবী। একবারে পাঁচ কেজি গরুর মাংস। চিনি সেমাই দুধ! সব কিছুই কিনে ফেলা যায় এক সাথে। আর কিছু টাকা দবিরকে দিলে তারও এক ঘন্টার মধ্যে কিছুটা হলেও দুঃখ ঘুঁচে যাবে। এ কি স্বপ্ন ? না কি বাস্তব ? রহমত শাহ এখন বিশাল মার্কেটের মাঝ খানে দাঁড়িয়ে আছে। যেন এক স্বপ্ন দুয়ারের সামনে। একেই বলে স্বপ্ন বিলাস। হঠাৎ রহমতের দু’চোখ বেয়ে লোনা পানির ধারা নেমে আসে। দাড়ি বয়ে সে চোখের জল টেবিলের উপর পরতে থাকে। রশিদ কবির দুজনেই হতবাক। বাবা কাঁদছে কেন? দেশে কি কোন ঘোর অমঙ্গলের অশনি সংকেত ? নাকি রশিদের কিছু এটা ক্ষতি হয়ে যাওয়ার আশঙ্খা ? রশিদ ভয় পেয়ে কাঁপতে থাকে। কারন পাগলা বাবা রশিদের নাম ধরেই কড়া সুরে ডাক দিয়েছিল। এক নিস্পলক মনোদ্বান্ধিক দোদুল্যমনতা দু’পক্ষকেই আচ্ছন্ন করে রেখেছে। কয়েক মুহুর্ত মাত্র। হঠাৎ চোখের পলকে রহমত শাহ রশিদের আংটি পরা হাতখানা এক টানে তার কোলের মধ্যে নিয়ে কয়েকবার রশিদের মুখের দিকে এবং রশিদের হাতের দিকে তাকিয়ে বললেন ”হারামজাদা দেখ সোনায় সোনা লাগিয়ে রেখেছে”। কি পরিমান বেআক্কেল হলি এই বদ নসিবী কাজ করে। এই কথা বলেই একটানে সোনার অংটিটা খুলে রহমতের বাম হাতের আঙ্গুলে থাকা একটি বড় পাথরের আংটি চোখের নিমিশে রশিদের ডান হাতের অনামিকায় পরিয়ে দিয়ে বললেন একক্ষুনি এক শত একান্ন বার সোবহান আল্লাহ পড়তি পড়তি সোজা পশ্চিম দিকে চলে যা। কথা আর কাজের মধ্যে এক মুহুর্ত সময় দেওয়া যাবে না। সময় দিলেই মানুষের মোহ ভঙ্গ হয়ে যায়। রশিদ উঠেই মন্ত্র মুগ্ধের মত বিরবির করতে করতে পশ্চিম দিকে রওনা হয়ে গেল। রহমত শাহ কবিরকে রশিদের পিছু পিছু যাওয়ার আদেশ করলেন। বললেন ছেলেটা পথের মাঝে জ্ঞান হারায়ে ফেলতি পারে। যা বাবা, ছেলেটার পাছে পাছে যা। মঙ্গল হবি মঙ্গল হবি তোদের বড়ই মঙ্গল হবি। পাগলের আদেশে করিরও রশিদের পিছু পিছু হাঁটতে থাকে। রহমত আর দবির মুহুর্তের মধ্যেই হাওয়া হয়ে গেল। আশে পাশের কোন স্বর্নের দোকানে যাওয়া যাবে না। এখন আর তাদের পেটে কোন ক্ষুধা নাই। মস্ত বড় একটা মওকা পাওয়া গেছে। বাবা বড়লোক ঈদ,তুমি এবার কোথায় যাবা ? পাগল রহমত শাহ আর দবির মহারাজপুরের জংলা রাস্তা দিয়ে জোড় পায়ে হাঁটতে থাকে। এক পর্যায়ে রাস্তার মাঝে দুজনেই হঠাৎ দাঁড়িয়ে পরে গ্যাস লাইটটা জ¦ালিয়ে নিয়ে আংটিটা দেখতে থাকে। খাঁটি সোনার আংটি। দু’আনা ওজনতোহবইি। আংটির উপর লেখা ’ঈদ মোবারক’। আহারে আংটিটা মনে হয় কোন ঈদে ব্যাচারী রশিদকে কেউ উপহার হিসেবে দিয়েছিল। দুরের মসজিদ থেকে সুরেলা মাগরিবের আজানের ধ্বনী ভেসে আসতে থাকে। সাঁঝের আঁধারে পথের নিশানা অস্পষ্ট হয়ে যাচ্ছে। এরপর ধীরে ধীরে রাতের আঁধার নেমে আসে। কৃঞ্চ পক্ষের শেষ দিবস। ঘন কালো অন্ধকারে রহমত শাহ আর দবির মহারাজপুরের জংলা রাস্তার মাঝে ধীরে ধীরে ঈদ আনন্দের উৎফুল্লতায় মিলিয়ে গেল।

Facebook Comments