রাজবাড়ী, ২৭শে আষাঢ়, ১৪২৭ বঙ্গাব্দ, শনিবার, ১১ জুলাই ২০২০

অলৌকিক অন্বেষণ—– এড.লিয়াকত আলী বাবু

প্রকাশ: ১৪ মে, ২০২০ ১০:১৪ : পূর্বাহ্ণ

রাজকন্ঠ ডেস্ক:

রাত তখন সারে তিনটা’র মত হবে। কৃঞ্চপক্ষ রাতের শেষ প্রহর। বাতি নিভিয়ে দিয়ে বিছানায় গা এলিয়ে দিতেই হঠাৎ মোবাইল ফোনটা বিরক্তিকর সুরে বেজে উঠলো। সবেমাত্র জটালু ফেসবুক থেকে লগ-আউট হয়েছে শরিফুল। সর্বশেষ ম্যাসেঞ্জারে চ্যাট হচ্ছিল ‘রূপা মৈত্রির’ সাথে। ‘রূপা’ জামাল পুরের মেয়ে। খুব ভালো কবিতা লেখে। আর ইনিয়ে বিনিয়ে ফেসবুকে বেশ ভালো ভালো পোষ্ট দিতে পারে। মেয়েটা খুবই বুদ্ধিদীপ্ত। ভাবছিল রূপাই হয়তো জরুরী কোন বিষয়ে ফোন দিয়েছে। রূপা মৈত্রির সাথে এখনো তার মুখো মুখি দেখা হয় নাই। তবে মাঝে মধ্যে গভীর রাতে মোবাইলে লো-ভয়েজে কুটুর কুটুর করে কথা হয়। লাইট না জ্বালিয়েই মোবাইল ফোনটা কানের কাছে নেয় শরিফুল। গভীর রাতের কোন ফোনই সাধারনতঃ সুসংবাদ বয়ে আনে না। গভীর রাতের ফোন মানেই দুঃসংবাদের একটা আগাম অশনি সংকেত। শরিফুল হ্যালো বলতেই ওপাশ থেকে সাব্বিরের কন্ঠ ভেসে আসে। শরিফুল দোস্ত কেমন আছিস? আমি তোর বন্ধু সাব্বির। চিনতে পেরেছিসতো ? সাব্বির!! সাব্বির মানে? কোন সাব্বির ? সাব্বিরতো এক বছর আগে মারা গেছে। পুরো নাম আতিকুল হক সাব্বির। ওর ব্রেইন টিউমার হয়েছিল। দীর্ঘদিন ধরে ভারতে চিকিৎসা করানোর পরও শেষ রক্ষা হয় নাই। শরিফুল নিজে সাব্বিরের দাফনে অংশ গ্রহন করেছিল। দাফন হয়েছিল বাদ মাগরিব। মাগরিবের নামাজের পর পরই দাফনের কাজ শুরু হয়। শেষ হয় এশার কিছু আগে। সেদিন ছিল ভরা পূর্ণিমা। ভয়ানক ভাবে বিভ্রান্ত হয় শরিফুল। এক লাফে বিছানার উপর উঠে বসে। বাম কান থেকে ফোনটা ডান কানে নিয়ে আসে। শরিফুল কি আবার ভয়-টয় পাচ্ছিস না কিরে ? সাব্বিরের মত কন্ঠ শুনে শরিফুলের শরীরের সব গুলো লোম সজারুর কাঁটার মত দাঁড়িয়ে যায়। ভারী হতে থাকে নিঃশ্বাস। গায়ে গরম বাতাসের হাল্কা ছোঁয়া লাগতে থাকে। আস্তে করে প্রতি-উত্তরটা দেয় ‘না ভয় পাই নাই’। কিন্তু তুই মানে সাব্বির!! মানে তুই আসলে— ? লাইটা জ্বালিয়ে নে বলেই সাব্বির হাল্কা একটা কাশি দিলো। কাশিটা খুবই পরিচিত কাশি। সাব্বিরের কাশির শব্দটা একটু ভিন্ন সুরের। এটা নিশ্চিত সাব্বিরের কাশি। শরিফুল বেড সুইচটা খুঁজে পাচ্ছে না। সাব্বির বললো বাম দিকে হাতরাচ্ছিস কেন? সুইচটাতো ডান দিকে। সুইচ ডান দিকে? শরিফুল ডান দিকে হাত দিতেই সুইচের সন্ধ্যান পায়। কিন্তু লাইট’টা জ্বললো না। ওহ্ বিদ্যুৎ চলে গেল ! বিদ্যুৎ যাক। ভয় নেই,আমি তোর বন্ধু সাব্বির। শরিফুল আবারও কাঁপা কাঁপা কন্ঠে বলে উঠে কোন সাব্বির ? আরে আমি তোর বন্ধু সাব্বির। আতিকুল হক সাব্বির। আগেই এতোটা ঘাবরে যাচ্ছিস কেন? খুব অন্ধকার তাই? আমার এখানে আরও ভয়াবহ অন্ধকার। গোরস্তানের আশে পাশে হয়তো লাইট টাইট আছে। কিন্তু কবরের ভিতরটায় খুবই অন্ধকার। কবরের ভিতরের অন্ধকারের বর্ননা দিয়ে তোকে কিছুতেই বোঝানো যাবে না। বুঝিসইতো কবরের মধ্যে রাত দিন কিছুই বোঝা যায় না। কখন রাত আসে আর কখন দিন হয় কিছুই বুঝি না। শুধু আঁধার আর আঁধার। একেবারে ভীষন মিশকালো অন্ধকার। তুই কবর থেকে কথা বলছিস মানে ? ধুর পাগল,মানে আবার কিরে ? থাকি কবরে আর ফোন দেব কি ঘর থেকে ? শরিফুলের শরীর ভীষন ভাবে কাঁপতে শুরু করে দেয়। শরিফুলের সমস্ত শরীর দিয়ে দরদর করে ঘাম ছুটছে। শরিফুল ফোনটা কানের সাথে আঁট সাাঁট করে ধরে পাথরের মত শক্ত হয়ে যেতে থাকে। শরিফুলের মনে হচ্ছে সাব্বির তার জানালার পাশে দাঁড়িয়ে কথা বলছে। কি হলো’রে শরিফুল ? কথা বলছিস না কেন? তুই কি আমার জানালার পাশে এসেছিস দোস্ত ? কেন তোর জানালার পাশে আসবো কেন? আমার কি তোর জানালার পাশে আসার কোন সুযোগ আছে নাকি ? না মানে মনে হচ্ছে তুই একেবারে আমার জানালার পাশে দাঁড়িয়ে কথা বলছিস। আরে পাগল,আমেরিকার থেকে কথা বললেও জানালার ওপাশ থেকে কথা বলছে বলেই মনে হয়। তুই কিন্তু অন্ধকারে বিছানার থেকে নেমে যাওয়ার চেষ্টা করিস না আবার । কেন? বিছানা থেকে নামবো না কেন? কোন সমস্যা ? আরে না কোন সমস্যা না। তবে বিদ্যুৎ আসলে নামতে একটু সুবিধা হবে সেই জন্য বললাম। কবর থেকে সরাসরি ঘরের সাথে সংযোগতো। সামান্য কিছু সমস্যাতো হতেই পারে। শরিফুল আরও ভয় পেয়ে যায়। খাটের পাশিটা শক্ত করে ধরে বসে। এই মুতুর্তে একটা সিগারেট ধরাতে পারলে খুব ভালো হত। এই মুহুর্তে সিগারেট খুব কাজে দেয়। নিকোটিন সাহস যোগাতে সাহায্য করে। কিন্তু সিগারেটের প্যাকেটটা দরজার পাশে টেবিলের উপর। ভীষন অন্ধকার। এই মুহুর্তে নামতে সাহস হচ্ছে না। কিরে নিজের থেকে কোন কথা বলছিস না কেন ? খুউব ভয় পেয়েছিস মনে হচ্ছে ? শরিফুল আরও একটু শক্ত হয়ে বসে। না ঠিক ভয় না। কেমন যেন একটু অস্থির অস্থির লাগছে। তা ,তুই কবরের মধ্যে মোবাইল ফোন পেলি কি ভাবে ? আমিতো কিছুই বুঝে উঠতে পারছি না। ও পাশ থেকে হাল্কা হাসির শব্দ ভেসে আসে। এখন শরিফুল একেবারে নিশ্চিত হয়ে যায়। এটা এক্সাক্ট সাব্বিরের হাসি। এখন আর কোনই সন্দেহ নেই। সাব্বির ভেঙ্গে ভেঙ্গে হাসতো। হাসির মধ্যে হুবহু মিল। একি স্বপ্ন নাকি বাস্তব ? শরিফুল বুঝে উঠতে পারে না। শরিফুল নিজের শরীরে চিমটি দিয়ে নিশ্চিত হয়ে নেয়। না এটা কিছুতেই স্বপ্ন না। এটা সুনিশ্চিত বাস্তব। শরিফুলের বড় ভাই রাকিবুল উঠোন পার হয়ে বাথ রুমের দিকে যাচ্ছে। বড় ভাই সিগারেট ধরিয়েছে। সিগারেটের নেশাযুক্ত সুঁধা গন্ধ পাওয়া যাচ্ছে। বড় ভাই ল্যাট্রিনে বসে দুটো করে সিগারেট খায়। তা না’হলে তার নাকি কিছুতেই ক্লিয়ার হয় না। শরীফুলেরও হঠাৎ প্রসাবের বেশ চাপ আসতে থাকে। এটা হয়তো ভয় পাওয়ার কারনের এক ধরনের রিএ্যাকশন। এই মুহুর্তে বড় ভাইকে ডাক দিতে ইচ্ছে করছে। প্রথম ডাকটা বড় ভাই যদি না শোনে তাহলে ভয় আরও বৃদ্ধি পাবে। এই শরীফ, খবরদার ! বড় ভাইকে ডাক দিস না কিন্তু। বড় ভাইকে ডাক দিলে তোর সাথে আমার আর গল্প করা সম্ভব হবে না। সবই কিন্তু সঙ্গে সঙ্গে ডিজ কানেক্ট হয়ে যাবে। বহু কষ্টে তোর সাথে সংযোগ পেয়েছি। এবার শরীফুলের অবস্থা আরও বেগতিক হয়ে যাচ্ছে। বড় ভাইয়ের ডাক দেওয়ার পরিকল্পনাটা সাব্বির কবর থেকে জানবে কি ভাবে ? শরীফুলের কাছে সব কিছুই কেমন যেন তালগোল পাকিয়ে যাচ্ছে।ওহ্ তুই জানতে চেয়েছিলি আমি কবরের মধ্যে মোবাইল ফোন পেলোম কি ভাবে ? তবে শোন, আমি যখন হাসপাতালে শুয়ে শুয়ে মৃত্যুর প্রহর গুনছি তখনই মনে মনে একটা ফন্দি এঁটেছিলাম। ডাক্তার আমার মৃত্যুর সর্বশেষ সময় দিয়েছিল ১৮ থেকে ২০ দিন। ডাক্তারের দেওয়া মৃত্যুর সময় সীমাটার কথা আমার কানে চলে আসে। আমি মৃত্যুটা’কে আমার জ্ঞান থাকা পর্যন্তু দেখার প্রস্তুতি নিয়ে ফেলি। কেউই জানে না তার মৃত্যু কখন হবে। কিন্তু আমি জানতাম আমার মৃত্যু ১৮ দিনের মধ্যে সম্পন্ন হবে। ২০ দিন পরে হলে দুই দিন বারতি সময় পাওয়া যাবে। সারা বিশ্বের সব চাইতে হৃদয়হীন ব্যাক্তি এডলফ হিটলার মৃত্যু কুপের মাঝে মৃত্যুর মুখো মুখি বসে তাঁর প্রেমিকা ইভা ব্রাউনের সাথে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হয়েছিল। বিবাহের মাত্র কয়েক ঘন্টার মধ্যে তাঁদের মৃত্যু হয়। প্রেম বিবাহ ও মৃত্যু’র এত কাছাকাছি অবস্থান এটাই এ যাবৎ কালের মধ্যে সর্বোচ্চ রেকর্ড। এই কথা গুলো চিন্তা করতে করতে আমারও মৃত্যুর সময় এগিয়ে আসতে থাকে। শরিফুল মন্ত্র মুগ্ধের মত সাব্বিরের কথা গুলো শুনছিলো। সাব্বির একটু কাশি দিয়ে আবার বলতে শুরু করলো। মৃত্যুর সময় এগিয়ে আসা পর্যন্তু মোবইলটা আমার কাছেই ছিল। মোবাইলের ঘড়ি দেখে মৃত্যুর সময় এগিয়ে আসার প্রহর গুনছিলাম। ১৮ দিনের দিন শুক্রবার হয়। শুক্রবারের দিনটা মুত্যুর জন্য খুব ভালো দিন। শুক্রবারে বেহেশতের দুয়ার খোলা থাকে। ২০ দিনের দিন রবিবার হয়। রবিবারটা মুসলমানদের জন্য ততটা শুভ দিন না। মনে মনে শুক্রবারের প্রত্যাশাই করছিলাম। আমার মনের শেষ আশাটা বোধ হয় আল্লাহ পাক বুঝতে পেরেছিলেন। ১৭ দিনের দিন সন্ধ্যার পর থেকে আমার শরীরটা ভীষন ভাবে খারাপ হয়ে আসতে থাকে। রাত্রে দশটার দিকে একটু দুধ ছাড়া আর কিছুই ক্ষেতে পারলাম না। সময় খুব দ্রুত ফুরিয়ে আসছিলো। আমি সবার অলৌক্ষ্যে মোবাইল সেট থেকে সীম এবং মোমোরী কার্ডটা খুলে হাতের মুঠোর মধ্যে নিয়ে নেই। ইচ্ছা ছিল সীম ও মোমোরী কার্ডটা জিহ্বার নীচে রেখে দেবো। মৃত্যুর হিসাবে ১৮ দিন হলে আর মাত্র কয়েক ঘন্টা সময় আছে। রাত বারোটার পর আমার ধীরে ধীরে শ্বাস কষ্ট শুরু হতে থাকে। আমি তখনই বুঝে ফেলি ২০‘দিন না ১৮‘দিনের শেষ মুহুর্তের মধ্যে হয়তো মৃত্যু দূত চলে আসবে। আস্তে আস্তে আমার চোখের পাতাও ভারী হয়ে আসতে থাকে। অনেক কষ্টে একবার তাকানোর চেষ্টা করলাম। চোখের সামনে সব কিছু হলদে রঙের মত মনে হলো। আমি গ্রামীন কোম্পানীর সীম আর মেমোরী কার্ডটা জিহ্বার নীচে নিয়ে নিলাম। পাশ থেকে কান্নার শব্দ কানে ভেসে আসছিল। মনে হলো মা’ কাঁদছে। ঐ মহুুর্তে পৃথিবীর সমস্ত ঘুম আমার চোখের উপর এসে ভর করছিল। ঐ সময়টা বন্ধু তোর কথাটা খুউব মনে হচ্ছিল। তোর সাথে শেষ সাক্ষাৎ হওয়ার প্রত্যাশাটা আমি অসুস্থ হওয়ার পর থেকেই আমার মনের মধ্যে জাগতে থাকে। তোর সাথে ছোট বেলার সব স্মৃতি গুলো মনের আয়নায় বার বার ভেসে উঠছিলো। গ্রামের গহীন জঙ্গল, চন্দনা নদীর পাড়,ছোট বেলার ক্ষুদে বন্ধুদের নিয়ে সেই যাত্রাপালা করা,লুকিয়ে লুকিয়ে বিনয় পালের বাগান থেকে পিয়ারা চুরি করে খাওয়া, স্কুলের মাঠে আষাঢ় মাসের বৃষ্টির মধ্যে বল খেলা আরও কত কি ? তোর কি এসব কথা মনে আছে শরিফুল ? শরিফুলের প্রতি-উত্তর শুধুই ‘হু’। মুহুর্তের মধ্যেই আমার জিভ,গলা এবং বুকটা শুকিয়ে কাঠ হয়ে যেতে লাগলো। ভয়ানক পানির পিপাসা লাগছিল। তখন কথা বলার শেষ শক্তিটুকু হারিয়ে ফেলেছিলাম আমি। ধীরে ধীরে কান্নার সংখ্যা বাড়তে থাকে। মনে হচ্ছে কান্নার শব্দ গুলো অনেক দুর থেকে ইথারে ভেসে আসছে। ধীরে ধীরে শ্রবন শক্তি হারিয়ে যাচ্ছে। বুকের উপর বিশাল একটা পাথরের চাপ অনুভব করছি। পাথরটা ধীরে ধীরে বুকের মাঝে বসে যাচ্ছে। বুকের উপর কে যেন পাথর চেপে ধরছে। ভয়ানক কষ্ট হচ্ছিল। এ কষ্ট বোঝানো যাবে না যাবে না বন্ধু, কিছুতেই বোঝানো যাবে না। এ কষ্টের সঠিক কোন ব্যাখ্যা নেই। এরপর বিশাল একটা লোমশ হাত আমার নাক মুখ চেপে ধরলো। আমি প্রান পনে ছুটে যাওয়ার চেষ্টা করছিলাম। কিন্তু ব্যর্থ হলাম। আমার সমস্ত শরীর অবশ হয়ে যাচ্ছে। কানের মধ্যে শোঁশোঁ শব্দ হচ্ছিল। চোখের পাতা দুটো ভেঙ্গে চোখের মনির উপর বসে গেল। এরপর মনে হতে লাগলো আমাকে কে যেন উড়িয়ে নিয়ে যাচ্ছে। মহা শুন্যের ভয়ানক অন্ধকারের মধ্য দিয়ে আমাকে চিৎকরে উড়িয়ে নিয়ে যাচ্ছে। উড়ে যাওয়ার সে কি ভয়ানক গতি। শুধু শোঁ শোঁ শব্দ হচ্ছে। আমি আর কিছুই স্মরন করতে পারছিলাম না। আমি কে,কি আমার পরিচয় ,কোথায় আমার নিবাস কিছুই মনে করতে পারছিলাম না। হঠাৎ মনে হলো আমি ভাসমান বরফ মেঘের মধ্যে ঢুকে যাচ্ছি। আমার সমস্ত শরীর বরফের মত ঠান্ডা হয়ে যাচ্ছিল। আমি ঠান্ডায় একেবারে কুঁকড়ে যাচ্ছিলাম। ধীরে ধীরে আমার নিশ্বাস বন্ধ হয়ে যেতে থাকে। আমি শতশক্তি প্রয়োগ করেও নিশ্বাস নিতে পারছিলাম না। সাব্বিরের কথা শুনে শরিফুলেরও নিশ্বাস বন্ধ হয়ে আসতে থাকে। শরিফুলের মনে হচ্ছে সাব্বিরের মত তারও এখন মৃত্যু হবে। শরিফুল পাথরের মত শক্ত হয়ে বসে আছে। কানের সাথে মোবাইল সেটটা যেন আঠার মত আটকে গেছে। আমার মেমোরী কার্ডে আমার মৃত্যুর সব ঘটনা রেকর্ড হয়ে আছে। এই শোন শরীফ,আমি তোকে আমার এই মেমোরী কার্ডটা দিয়ে দিতে চাই। তুই ঐ মেমোরী কার্ডটা ওপেন করলেই দেখতে পাবি মৃত্যু কতটা ভয়ঙ্কর। শোন, তোকে একটু কষ্ট করে আমার কবরের পাশে আসতে হবে। আমার কবরের মাথার দিকে ছোট্ট এক ছোপ দুবলা ঘাসের জট হয়েছে। তার সাথেই ছোট্ট এক খন্ড পাথর পাবি। ঐ পাথরটা সরালেই পলিথিন দিয়ে প্যাচানো আমার মেমোরী কার্ডটা পেয়ে যাবি। প্লিজ ঐ মেমোরী কার্ডটার ছবি শুধু তুই একা একা বসে দেখবি। মোমোরী কার্ডের মধ্যে আমার ঐ মৃত্যুর দৃশ্যটা দেখার পর তোর সাথে এই ফোনে আমার আবার কথা হবে। কারন আমার মৃত্যুর শেষ দৃশ্য আমাকে জানতেই হবে। আমি আমার মৃত্যুর শেষ দৃশ্যটা দেখতে চাই। আল্লাহু আকবর। ফজরের আজানের ধ্বনী ভেসে আসতেই সাব্বিরের ফোনের লাইনটা হঠাৎ করেই কেটে গেল। শরিফুল আরও দুই তিনবার হ্যালো হ্যালো করে কোন সারা শব্দ না পাওয়ার পর সাব্বির ফোনের সুইচটা অপ করে দিয়ে ঘরের লাইট জ্বালায়। ঘরের মধ্যে সব কিছইু ঠিক ঠাক আছে। শরিফুল এতক্ষন একটা ঘোরের মধ্যে ছিল। আঁধারের ফোন আলাপের ঘোর কেটে যাওয়ার পর শরিফুল কিছুক্ষন মেঝেতে ঠায় দাঁড়িয়ে থাকে। তাপপর পাঞ্জাবীটা গায়ে দিয়ে মোবাইল ফোনটা হাতে নিয়ে ঘর থেকে বের হয়ে যায় শরীফুল। বাড়ীর উত্তর দিকে মসজিদ। মসজিদটা বহু পুরোনো। শরিফুল সোজা মসজিদের পাশে গিয়ে দাঁড়ায়। তখনো মোয়াজ্জিন ছাড়া কোন মুসল্লি মসজিদে আসে নাই। শরিফুলের ঘোর কাটছে না। শরিফুল মোবাইল সেটটা হাতে নিয়ে মসজিদের সামনের পুকুর পাড়ে গিয়ে কিছুক্ষন চুপ চাপ দাঁড়িয়ে থাকে। মোবাইল ফোনটা তার হাতে রাখতে খুব ভয় করছে। মনে হচ্ছে এখনই বুঝি আবার সাব্বিরের ফোন কল চলে আসবে। শরিফুল সাব্বিরের মোবাইল ফোনের নামব্বারটা চেক করতে গিয়ে হঠাৎ চমকে উঠে।এ কি ? এ তো শুধু এগারটা শুন্য ডিজিট। শরীফুল আরও ভীত হয়ে পরে। এ কেমন নাম্বার ? শরিফুল ঐ শুন্য নাম্বারেই ফোন ব্যাক করে। ওপার থেকে ভেসে আসে,আপনি যে নাম্বারে ফোন করেছেন তার কোন অস্তিত্ব নেই। অস্তিত্ব থাকারও কথা না। সবই যেন তালগোল পাকিয়ে যাচ্ছে। এ কেমন ভয়ানক এবং ভৌতিক অলৌকিকতা ? শরিফুল হঠাৎ করেই হাতের মোবাইল ফোনটা ছুড়ে মারে পুকুরটার মাঝখানে। টুব্বুস করে একটা শব্দ হয়। চারিদেকে পানির গোল পাকানো ঢেউ উঠে আবার নিমিশেই বিলিন হয়ে যায়। এরপর শরিফুল অজু করে ধীরে ধীরে মসজিদের মাধ্যে ঢুকে পরে।

Facebook Comments