রাজবাড়ী, ১৮ই অগ্রহায়ণ, ১৪২৯ বঙ্গাব্দ, শনিবার, ৩ ডিসেম্বর ২০২২

হানড্রেড পার্সেন্ট মিথ্যা গল্প ———— এড.লিয়াকত আলী বাবু

প্রকাশ: ৭ মে, ২০২০ ৮:০৫ : অপরাহ্ণ

প্রিন্ট করুন

রাজকন্ঠ অনলাইন:

রাজা রসিক রাজ ত্রিমোহনীর বেশ কিছুদিন ধরে ঘুম হচ্ছে না। শতভাগ সত্য কথা না কি বলা যায় না। আবার শত ভাগ মিথ্যা কথাও না কি বলা যায় না। এই রকম একটা মনস্তাত্বিক চিন্তায় পরে রাজা ‘রসিকরাজ ত্রিমোহনী’ রাজ প্রাসাদের চিলে কোঠায় একাকী বসে নিরিবিলি সময় কাটাচ্ছিলেন। বলা চলে সত্য মিথ্যার ‘একক’ অনুসন্ধানে নিজেকে চিলে কোঠায় স্বেচ্ছায় গৃহবন্দীর মত আটক করে রেখেছেন। রানী মা ‘বিজয়া সুন্দরী দেবী’ রাজ প-িত ডেকে আনালেন। প-িতজী রাজার সাথে চিলে কোঠায় গিয়ে গোপনে দেখা করে আসার পর রাজা মশাই কিছুটা অসস্থি হয়ে নেমে আসলেন বটে কিন্তু তার মাথা থেকে সত্য মিথ্যার শত গুনের অংকটা কিছুতেই ঝেড়ে ফেলতে পারছিলেন না। পরে রাজ প-িতের পরামর্শে চারিদিকে ঢোল পিটিয়ে দেওয়া হল। বলা হল রাজা মশাইকে যে একটি সম্পুর্ন মিথ্যা গল্প শোনাতে পারবে তাকে এক সহস্র স্বর্ন মুদ্রা বকশিষ দেওয়া হবে। রাজ প্রাসাদের সামনে তৈরী করা হল সুবিশাল বৈঠকী মঞ্চ। শুরু হল রাজার গল্প শোনার পালা। রাজা মশাই সহ সভাসদ মিলে প্রতিদিন গল্প শোনার জন্য উপস্থিত হতে থাকলেন। একে একে বহু গল্পকার এসে গল্প বলতে লাগলো বটে কিন্তু শত ভাগ মিথ্যা বা শত ভাগ সত্য গল্প কেউই বলতে পারছিল না। এ ভাবেই গল্প শোনার পালা চলছিল মাসের পর মাস। কিন্তু রাজা মশায়ের মনের প্রশ্নের উত্তর মিলছে না। শত ভাগ মিথ্যা কিংবা শত ভাগ সত্য গল্প কেউই বলতে পারছে না। তাহলে সত্য মিথ্যার ককটেল ছাড়া কি গল্প বলা চলে না বা জীবন যাপন করা চলে না ? এরই মধ্যে সাত সকালে এক যুবক রাজ প্রসাদে এসে হাজির। যুবকের চেহারার মধ্যে একটা বুদ্ধিদীপ্ত উজ্জ্বলতা যেন ঠিকরে পরছে। কালো রঙের পাঞ্জাবীর সাথে কালো রঙের পাজামা। মাথায় কালো টুপি এবং পায়ে মিশ কালো জুতা। কাঁধের উড়না খানাও কালো। সর্বশেষ চোখে কালো চশমা। তবে যুবকটির গায়ের রঙ অতীব ফর্সা। কালো আবরনের মাঝ দিয়ে শরীরে যতটুকু দেখা যাচ্ছিল তাতে মনে হচ্ছিল শরীর থেকে জ্যোৎস্নার আলো ঠিকরে বেড় হচ্ছে। রাজা মশাইয়ের কাছে সংবাদ পাঠানো হল। বলা হল এক যুবক গল্প বলতে এসেছে। রাজা মশাই যুবককে রাজ অতিথি শালায় আপ্যায়ন করতে নির্দেশ দিলেন। যুবককে রাজ অতিথি হিসাবে আপ্যায়ন করা হল। এরপর রাজা মশাই রাজ সভাসদগন’কে রাজ সভা কক্ষে আমন্ত্রন জানালেন। রাজ সভা কক্ষে রাজ অতিথি দিয়ে পরিপুর্ণ হয়ে গেল। যাকে বলে হাউজ ফুল। এরপর যুবক’কে রাজ মঞ্চে বসানো হল। পিন পতন নিস্তব্ধতা। সবাই যুবকের দিকে তাকিয়ে আছে। যুবক চারিদিকে একবার তাকিয়ে সকলকে একবার দেখে নিলেন। এরপর যুবকটি রাজা মশাই ও রাজ সভাসদের দিকে কড়জোড়ে কুর্নিশ করে নিলেন। যুবক ধীরে সুস্থে তার আসনে বসে সকলের উদ্দেশ্যে আবার হাত নাড়ালেন। এরপর রাজা মশাইয়ের কাছ থেকে গল্প বলার অনুমতি নিয়ে গল্প বলতে শুরু করতে যাবেন সেই মুহুর্তে রাজা মশাই যুবকটিকে জিজ্ঞাসা করলেন তোর সকল কালো জিনিস পরিধানের কি বিশেষ কোন কারন আছে ? যুবকটি এক গাল হেসে দিয়ে বললো হুজুর এর একটা কারন আছে। হাসি দেওয়ার সময় যুবকের দাঁত গুলো মুক্তার দানার মত মনে হচ্ছিল। যুবকটি বললো,হুজুর আমি একটি সম্পুর্ন এবং শতভাগ মিথ্যা গল্প বলতে এসেছি। আর মিথ্যা গল্প বলার সময় আমি সব সময় কালো কাপড় পরিধান করে থাকি। কারন মিথ্যার রঙ হয় মিশ মিশে কালো। প্রথমে যুবক রাজা মশাইয়ের দিকে তাকিয়ে বললেন হুজুর আজ আমি একটা সম্পুর্ন মিথ্যা এবং অবাস্তব গল্প বলে শোনাবো। রাজা মশাই বললেন দেখ সত্য হয়ে গেলে কিন্তু তোমাকে একটা কানা কড়িও দেওয়া হবে না। এরই মাঝে রাজমন্ত্রী ‘দিশাই পন্ডিত’ রাজা মশাইকে বললেন হুজুর গোস্তাকী মাফ করবেন। এক লক্ষ স্বর্ন মুদ্রা দিয়ে মিথ্যা গল্প শুনতে হবে কেন হুজুর ? রাজা মশাই গম্ভীর কন্ঠে বললেন পন্ডিত মশাই আপনাকে সত্য মিথ্যার কারন অনুসন্ধান করতে বলা হয় নাই। পন্ডিত মশাই সহসাই মাথা নিচু করলেন। যুবক তার গল্প বলতে শুরু করলো। হুজুর,আমার বয়স যখন ১৩ কি ১৪ বছর হবে তখন আমার আব্বার জন্ম হল। জন্মক্ষন শুক্ল পক্ষের সুপ্রভাতে (!)। তখন ভোরবেলার মুরগী ডাকছিল। আব্বা জন্ম নেওয়ার পর পরই গল্প করতে শুরু করে দিলেন। ঠিক মামাবাড়ীর আব্দারের মত। আব্বা বললেন এখনই তাকে বাজারে নিয়ে যেতে হবে। সে কি কান্না ! কান্নার সুরেই বলতে লাগলেন আমি বাজারে যাব আমি বাজারে যাব-আমাকে তাড়াতারি বাজারে নিয়ে যা। দাদীতো আব্বার আব্দারে একেবারে অস্থির হয়ে পরলেন। তার এক মাত্র ছেলে বাজারে যেতে চাচ্ছে এ কি যাই তাই আনন্দের কথা ? অবশেষে দাদীজান আমার আব্বাকে জামা কাপড় পরায়ে আমার কাছে দিলেন বাজারে নিয়ে যাওয়ার জন্য। আমি আব্বাকে বললাম ‘বাজান বাজারতো বহু দুরে আমি সারা পথ তোমাকে কোলে করে নিতে পারবো না’। আব্বা বললেন কিছুদুর কোলে চড়ে যাওয়ার পর আমি হেঁটেই যেতে পারবো। আব্বা বলে কথা। আব্বার কথা কি আর অমান্য করা যায় ? না কি বলেন হুজুর ? অগত্যা আব্বাকে কোলে করে নিয়ে বাজারের দিকে রওনা হলাম। সেদিন ছিল বৃহস্পতিবার হাটবার। যেদিন বাজার আর হাট এক সাথে থাকে সেদিন বাজারে ভীষন ভীড় থাকে। বাজারের মধ্যে ঢুকেই দেখি এক লোক মজমা জমিয়ে হাটে ঔষধ বিক্রি করার জন্য মোড়গ লড়াই খেলা দেখাচ্ছেন। দুইটি মোড়গ প্রথমে দুই পাশে বসে থাকে। লোকটা ওয়ান টু থ্রি বলার সাথে সাথে মাঝখানে এসে লড়াই শুরু করে দেয়। আবার লোকটি ষ্টপ বললেই মোরগ দুইটি দুই পাশে গিয়ে অবস্থান নেয়। এই ভাবে একবার লড়াই করতে করতে দুই মোড়গই দুই পাশে দুইটি ডিম পেরে ফেললো। আমি জানি হুজুর মোড়গের ডিম খুবই মজাদার হয়। এদিকে আব্বাও ডিম দুটি কেনার জন্য আবার কান্না কাটি শুরু করে দিল। কি আর করা। আব্বার কাছে খাইছি যখন ধরা। আব্বার ইচ্ছাই আমার ইচ্ছা। আমি মোড়গের ডিম দুটি নগদ হিসাবে বাঁকিতে কিনে নিয়ে সোজা বাড়ী চলে আসলাম। এরপর আমি দাদীকে বললাম ডিম দুটি বেশী করে পেঁয়াজ মরিচ দিয়ে ভেজে দিতে। কিন্তু ব্যাগড়া বাধালো আব্বা। আব্বা ঐ ডিম ভাজতে দেবে না। সে ঐ ডিম দিয়ে বাচ্চা ফোটাবে। এখন বাচ্চা ফোটাতে হলেতো ওঁম দেওয়া বাইতে মুরগী দরকার। না হলে ডিম ফুটবে কি ভাবে ? ডিমে বাতাস লাগলে ডিম ফুটানো যায় না। আমাদেরে বাড়ীতে আমার দাদার বাপের নিজের হাতে বানানো একটা বিশাল পিতলের কলস ছিল। শেষ পর্যন্তু ঐ কলস পানিতে ভরে ঐ পানির মধ্যে ডিম দুটি ছেড়ে দিয়ে নতুন কাপড় দিয়ে কলসের মুখ টাইট করে বেঁধে দিলাম। যাতে ডিমে বাতাস না লাগে। এরপর ঠিক ২১ দিন পর কলসের মুখ খুলে দেখি এক অবাক কান্ড। কলসের মধ্যে কালো রঙের নাদুস নুদুস দুটো রাম ছাগলের বাচ্চা জন্ম নিয়েছে। ছাগল ছানা দুইটির ইয়া বড় বড় কান। সমস্যা হল কলসের মুখ খুবই ছোট। এই কারনে কলসের ভীতর থেকে ছাগলের বাচ্চা দুটোকে বের করা যাচ্ছিল না। ছাগলের বাচ্চা দুটো কলস থেকে বের হওয়ার জন্য ভ্যাঁ ভ্যাঁ শব্দে বাড়ী-ঘর সব মাথায় তুলে নিল। এরপর গঞ্জে গিয়ে কড়াতি ডেকে নিয়ে আসা হল। অবশেষে কড়াত দিয়ে কলস কেটে রাম ছাগলের বাচ্চা দ’ুটোকে অবমুক্ত করা হল। রাম ছাগল বলে কথা ! আমাদের বাড়ীর উত্তর ভিটায় আবার একটা বিশাল তাল গাছ ছিল। ঐ তাল গাছের মাথায় ছিল সারে তিন বিঘা জমি। ওটা দাদার আমলের জমি। অত উচুঁতে গরু উঠানো যায় না দেখে তাল গাছের উপরের ঐ জমি টুকু সব সময়ই পতিত পরে থাকতো। আব্বা বললো এবার আর কোন সমস্যা নাই। রাম ছাগল দুটো দিয়ে তাল গাছের উপরের জমি টুকুতে চাষবাস করা যাবে। যেই কথা সেই কাজ। আমি আর আব্বা দু’জনে মিলে রাম ছাগল আর লাঙল নিয়ে সোজা তাল গাছে উঠে গেলাম। তারিখটা ছিল ৩১ শে ফেব্রুয়ারী। আব্বা আর আমি দুজনে মিলে তাল গাছের উপরের জমি চাষ করে ইরি-৮ জাতের কালোজিরা ধান লাগিয়ে রেখে আসলাম। তাল গাছের রস দিয়ে সেচের ব্যবস্থা করা হয়েছিল। তিন মাস পর আমি আর আব্বা তাল গাছের মাথায় গিয়ে আমাদের দুজনেরই চোখ দাঁড়িয়ে গেল। সারা ক্ষেত ভরা বেশুমার সরিষা হয়েছে। এত ঘন সুরিষার ক্ষেত এর আগে কখনোই দেখি নাই। সরিষায় হাল্কা পাক ধরেছে। এক সপ্তহের মধ্যেই কাটা যাবে। আব্বা আর আমি বাড়ী চলে আসলাম। এক সপ্তাহ পরে আমি আর আব্বা দুজনেই কাঁচি নিয়ে তাল গাছের উপরের সরিষা ক্ষেতে গেলাম সরিষা কাটার জন্য। আমি ছিলাম আগে আর আব্বা ছিল পাছে। আমি গাছে উঠেই একটি অবাক করা দৃশ্য দেখে আঁতকে উঠলাম। হুজুর বিশ্বাস করেন আপনিও ঐ অবস্থা দেখলে সত্যি সত্যি আঁতকে উঠতেন। রাজা মশাই একটু নড়েচড়ে বসলেন। এক সহস্র স্বর্ন মুদ্রা বোধ হয় আজ বেড় হয়েই যায়। রাজা মশাই জিজ্ঞাসা করলেন কি দেখে তুমি আঁতকে উঠলে হে যুবক ? হুজুর সেই কথাইতো বলতে চাচ্ছি। আমি তাল গাছে উঠে সবে মাত্র সরিষার ক্ষেতের মধ্যে ঢুকতে যাচ্ছি। হঠাৎ দেখি একটা সরিষার বড় একটা দানা দুই দিক থেকে দুইটা বড় পিঁপড়া টানাটানি করছে। হুজুর আমি কিন্তু বুঝে ফেলেছিলাম যে কি সর্বনাশা দূর্ঘটনা ঘটতে যাচ্ছে। ভয়ানক দূর্ঘটনা ঘটবে। যে ঘটনা নিয়ে ভয় পাচ্ছিলাম শেষে কি না ঠিক সেই দুর্ঘটনাটাই ঘটে গেল। রাজসভার সবাই যুবকের দিকে তাকিয়ে আছে কি দুর্ঘটনাটা ঘটেছিল সে কথাটা শোনার জন্য। রাজা মশাইও খুব অস্থির হয়ে পরলেন কথাটা শোনার জন্য। কি হলো যুবক ? বলছো না কেন কি দূর্ঘটনা ঘটেছিল ? হুজুর আমার কোন দোষ ছিল না। আমি এক লাফে কাছে চলেও গিয়েছিলাম। কিন্তু তার আগেই কাজ শেষ। আমি ঠেকাতে পারলাম না হুজুর, আমি ঠেকাতে পারলাম না। আমি ঠেকানোর আগেই পিঁপড়া দুটি টানাটানি করতে গিয়ে সরিষাটাকে ফাটায়ে ফেললো। সবাই সমস্বরে বলে উঠলো, তারপর ? যুবকটি বললো তারপর আবার কি ? যা হবার তাই হল। সরিষার থেকে ফিনকি দিয়ে তেল বেড় হতে লাগলো। সে কি তেল। তেলে তেলে সমগ্র মাঠ যেন তেলারন্য হতে শুরু করে দিল। প্রথমে পায়ের গিড়া পর্যন্তু তেল তারপর হাঁটু তেল তারপর ধীরে ধীরে মাজা তেল। যেন জীবন বিপন্ন হওয়ার মত অবস্থা। যখন বুক তেল হয়ে গেল তখন আমি আমার আব্বাকে কাঁধের উপর তুলে নিলাম। অবশেষে তেলে সাঁতারে পরে গেলাম। তেলের মধ্যে সাঁতার কাটা যে কত কঠিন কাজ সেটা কাউকেই ঠিক বোঝানো যাবে না হুজুর। আমি আব্বা কে কাঁধে নিয়ে তেলের মাঝে সাঁতার কেটে চলেছি। চারিদিকে শুধু তেল আর তেল। মনে হল যেন তেল সমুদ্রে সাঁতার কাটছি। চারিদিকে কোন কূল কিনারা দেখা যাচ্ছিল না। হুজুর একেবারে তেল সাঁতারে ডুবে যাচ্ছিলাম প্রায়। হঠাৎ দেখি একটা সওদাগরি পানশি ভেসে আসছে আমাদের দিকে। আব্বা তার কোমড় থেকে লাল গামছাটা খুলে ডান হাত দিয়ে গামছাটা উড়াতে লাগলো। ওরে বাবা সেওতো দেখি বিশাল এক তেলের ট্যাঙ্কার। আমার বাবার লাল গামছা নাড়া দেখে তেল ভরা ঐ জাহাজটা আমাদের দিকে এগিয়ে এলো। ব্যাস, দিলাম দুই বাপ বেটা লম্বা একটা লাফ। এক লাফে জাহাজের একেবারে মাঝখানে। জাহাজটা ভীষন ভাবে দুলে উঠলো। উঠুক,এটাতো আর আমাদের কোন দোষ না। জাহাজ এগোচ্ছে সুন্দর বনের দিকে। কি মনোরম দৃশ্য। আমাদের বাপ-বেটার সারা গায়ে তেল আবার এদিকে জাহাজ ভরা তেল। আমরা প্রায় সুন্দর বনের কাছা কাছি চলে এসেছি। এরই মাঝে হঠাৎ শোরগোল। কি হলো, কি হলো। তেলের জাহাজ ফুটো হয়ে গেছে। আমার আব্বার হাতে সরিষা কাটার যে কাচি ছিল তারই আঘতে নাকি ঐ জাহাজটা ফুটো হয়ে গেছে। জাহাজ আস্তে আস্তে ডুবে যাচ্ছিল। ফুটো বন্ধ করার বহু চেষ্টা করেও সকল চেষ্টা ব্যর্থ হয়ে গেলো। অবশেষে তেলের জাহাজটা সুন্দরবনের কাছা কাছি গিয়ে ডুবে গেল। আমরা দুই বাপ-ব্যাটা সরিষা আর মোবিল তেলে লেজে গোবরে জড়িয়ে সাঁতরাতে সাঁতরাতে বহু কষ্টে কূলে গিয়ে উঠলাম। তারপর শুনি সুন্দরবনে তেল ছড়িয়ে পড়ায় পরিবেশের কি ক্ষতি হচ্ছে তার জন্য বিদেশী বিশেষজ্ঞ দল অলরেডি সুন্দরবনে ঢুকে পড়েছে। পরি কি মরি,অমনি আমরা বাপ বেটা একটা বড় ঝাপটা গাছের মধ্যে লুকিয়ে পরলাম। না জানি পাছে আবার আমাদের উপর দোষ চাপায়। উদোর পিন্ডি বুধোর ঘারে এসে পড়তে পারে। এদেশে এ অবস্থা হয়। দোষ করে একজন আর সাজা ভোগ করে আরেকজন। হুজুরতো এ দেশের সব সব ঘটনাই জানেন। এ্যাক্সিডেন্ট করে এক গাড়ী আর জনগন ভাংচুড় করে আরেক গাড়ী। সেখানেও মিথ্যার বাহাদুরি। হঠাৎ দেখি বিশেষজ্ঞ দল আমাদের ঝোপটার দিকে এগিয়ে আসছে। নিঃশ্বাস বন্ধ করা নিস্তব্ধতায় ঝোপের মধ্যে বাপ-ব্যাটা বসে আছি। বিশেষজ্ঞ দল আমাদের ঝোপের পাশে এসে একটা বড় হরিণকে ইশারায় ডাক দিয়ে কাছে নিয়ে এলো। হরিণ থর থর করে কাঁপছে। কারন যে তেল নিয়ে তদন্ত হবে সেই তেল হরিণটির সারা গায়ে লেপ্টে আছে। হরিণটির সারা শরীরে তেল চপ চপ করছে। হ্যাট পরা লম্বা মত এক বিশেষজ্ঞ হরিণটিকে বললো-তুমি ভয় পেয়ো না। আমরা শুধু তদন্ত করতে এসেছি। তোমাদের কোন ভয় নাই। হরিণটি বললো, স্যার মানুষকে ভয় পাবো না তাই কি হয় ? মানুষ সম্পর্কে আপনাদের কি কোন আইডিয়া আছে ? বাঘেতো আমাদের খায়ই ,কারন আমরা ওদের খাদ্য। কিন্তু মানুষ যখন বন্দুক দিয়ে ফুটুস করে দেয় তখন আর আশরাফুল মাকলুকাত হিসাবে মানুষের প্রতি কোন শ্রদ্ধাবোধ থাকে ? এই মানুষই হচ্ছে পৃথিবীর সবচাইতে খারাপ প্রাণী। এদের কোন মা-মাসী নাই। যা যখন পায় তাই তখন খায়। বিশেষজ্ঞ দল হরিণটির কথা শুনে একটু বিব্রত হয়ে পরলো। আচ্ছা এই যে সুন্দরবনের মাঝে তেল ছড়িয়ে পড়েছে এতে কি তোমাদের কোন ক্ষতি হয়েছে ? হরিণটা কিছুটা লজ্জা পেয়ে মাথা নিচু করে। বিশেষজ্ঞ বললো লজ্জার কিছু নেই তুমি নির্লজ্জ ভাবে নির্ভয়ে বলতে পারো। হরিণটা বললো- স্যার তেলে কার কি সমস্যা হয়েছে তা আমি বলতে পারবো না। তবে আমার বড়ই উপকার হয়েছে। বিশেষজ্ঞ অবাক বিস্ময়ে জিজ্ঞাসা করলেন তোমার কি উপকার হয়েছে গো ? হরিণটি বললো যে- তেলে সুন্দরবন সয়লাভ হয়ে গেছে এই কথা শুনে আমি তেল দেখার জন্য পানিতে নেমে পরি। তারপর আমার সারা শরীর তেলে চুপচুপে হয়ে যায়। ঐ তেলের সে কি গন্ধরে বাবা। এরপর ডাঙ্গাতে উঠার পরই রয়েল বেঙ্গল টাইগার তিনি তিন বার জাম্প করেছে আমার উপর এবং তিন তিন বারই স্লিপ কেটেছে। প্রথমেতো রয়ের বেঙ্গলের কথা শুনে চোখ চরক গাছে উঠে গেছিলো। হায় বাবা ! কি বলে’রে রয়েল বেঙ্গল টাইগার ? বাঘের মুখের সামনে এসে কি না আমরা আশ্রয় নিয়েছি ? কিন্তু হুজুর হরিণের কথা শুনে বুকে পানি এলো। বাঘ যখন হরিণ ধরতে গিয়ে শুধু মোবিল তেলে স্লিপ কাটছে তখন আমাদের সরিষা আর মোবিল মেশানো তেলে স্লিপ কাটবে তাতে কোনই সন্দেহ নাই। ঘটনাও ঘটলো তাই হুজুর। সুন্দরবনের জঙ্গল থেকে বের হয়ে চুপি চুপি নদীর দিকে এগোচ্ছি। এই ধরেন নদী প্রায় পাই পাই ভাব। তখনই দুটো রয়েল বেঙ্গল টাইগার এসে আমাদের দু’জনের উপর ঝাপিয়ে পরলো। আরে বাবা কি ভয়ানক শক্তি গায়। কিন্তু হুজুর মিস ফিল্ডিং। স্লিপ কেটে দশ হাত দুরে গিয়ে পরলো। আমরাও ভৌঁ দৌড়। আমরাও দৌড় বাঘও দৌড়। এবার রয়েল বেঙ্গলের সেকেন্ড জাম্প। সেখানেও ক্যাচ মিস। উল্টে গিয়ে পরলো নদীর মধ্যে। অমনি বাঘকে ধাওয়া করলো কুমির। কুমিরও ফেল ! শুধু তেলের কারনে বাঘও পিছলে গেলো কুমিরের মুখ থেকে। বাঘ আর কুমির যখন তেল চুবানীতে ব্যাস্ত তখন আমরা সেই ফাঁকে সাঁতরায়ে নদী পার হয়ে গেলাম। এ কি যাই তাই ব্যাপার হুজুর ? বাঘের মুখের থাবা থেকে ফিরে আসা। তবে সমস্যা হয়েছিল আব্বার। কারন আব্বাতো ছোট মানুষ। তা ছাড়া এটাতো আমার আব্বার জীবনের প্রথম ঘটনা। অবশেষে বাড়ী ফিরে যাওয়ার পথে শুনলাম এ যুগের এক পাগলা রাজা শতভাগ মিথ্যা গল্প শোনার জন্য আসর বসিয়েছেন। ব্যাস এসে গেলাম। তা হুজুর কেমন শুনলেন ? রাজা মশাই এতক্ষন একটা ঘোরের মধ্যেই ছিলেন। বালকটির প্রশ্ন শুনে সম্বিত ফিরে পেলেন। রাজা বললেন আমি ভীষন খুশি হয়েছি। এই কথা বলে তিনি ঐ গল্প বলা ছেলেটির হাতে একলক্ষ স্বর্ন মুদ্রার একটি পোটলা তুলে দিয়ে বললেন ’তুমি খুশিতো ? ছেলেটি বললো হুজুর আমি কিন্তু খুশি না। রাজা মশাই ছেলেটির কথা শুনে একেবারে তেলে বেগুনে জ্বলে উঠলেন। কি এত বড় কথা। একলক্ষ স্বর্ন মুদ্রা পেয়েও তুমি খুশি হও নাই ? ছেলেটি বললো হুজুর আমি খুশি হয়েছি এই কথা যদি সত্যি হয়ে যায় তাহলে যদি সত্য গল্প হওয়ার জন্য টাকা ফেরৎ নিয়ে নেন ? তখন উপায় কি হবে ? তাই খুশি হওয়ার পরেও মিথ্যা কথা বলেছি। কারণ হান্ড্রেড পারসেন্ট মিথ্যা গল্প।