রাজবাড়ী, ১৯শে অগ্রহায়ণ, ১৪২৯ বঙ্গাব্দ, রোববার, ৪ ডিসেম্বর ২০২২

মহান ’মে দিবস ও বাংলাদেশের শ্রমিকের অধিকার——-এড. লিয়াকত আলী বাবু

প্রকাশ: ৩০ এপ্রিল, ২০২০ ৮:৩৮ : অপরাহ্ণ

প্রিন্ট করুন

আমেরিকার স্বাধীনতার ১১০ বৎসর পূর্ন হতে যাচ্ছিল সে বছর। সালটা ছিল ইংরেজী ১৮৮৬ সাল। স্বাধীনতার শত বছর পরেও শ্রমিকদের স্বাধীনতাতো অনেক দুরের কথা শ্রকিমরা যে মানুষ এ সত্যটিও সুপ্রতিষ্ঠিত ছিল না তখন পর্যন্তু। তামাম পৃথিবীর খেটে খাওয়া সাধারন শ্রমিক শ্রেনীর মানুষ কখনোই স্বাধীনতার প্রকৃত স্বাদ গ্রহন করতে পারে নাই এবং আগামী হাজার বছরেও স্বাধীনতার প্রকৃত স্বাদ গ্রহন করতে পারবে কিনা সন্দেহ আছে। আমেরিকার স্বাধীনতার ১১০ বৎসর পর ফ্রান্স সরকারের সৌজন্যতায় আমেরিকার নিউইয়র্ক পোতাশ্রয়ে স্থাপিত হয়েছিল স্বাধীনতার আলোকবর্তিকা ছড়ানো এক মহিয়সী নারী মূর্তির হাতে উত্তোলিত স্বাধীনতার দীপ্ত মশাল (স্ট্যচু অব লিবার্টি)। আর সেটা ছিল ১৮৮৬ সাল। সেই ১৮৮৬ সালেই আমেরিকার স্বাধীনতার সূর্য মশালের দীপ্ত অলোক বর্তিকার আলোতেই শিকাগো শহরে ১০ জন শ্রমিকদের তাজা রক্তে রঞ্জিত হয়েছিল আমেরিকার শিকাগো শহরের সেই ঐতিহাসিক রাজপথ। আমরা যেমন এখনও আইনকে মাথায় তুলে রেখে মানবতাকে পদদলিত করি। সেদিনও ঠিক তাই হয়েছিল। সেদিনও নির্দয় ভাবে ভুলুন্ঠিত হয়েছিল মানবতা। শ্রমিক বিদ্রোহের অজুহাতে দেশদ্রোহিতার অপরাধে ফাঁসিতে ঝুলিয়ে হত্যা করা হয়েছিল আরও ৭ জন শ্রমিককে। আজ যারা ফাঁসির বিরোধীতা করছেন ঠিক তারাই সেদিন নিজেদের হীন স্বার্থ রক্ষার জন্যই ৭’জন নিরীহ শ্রমিককে ফাঁসিতে ঝুলিয়ে নির্ধিধায় বিশ্ব মানবতাকে ভুলুন্ঠিত করেছিলেন। সে দিন শ্রমিকদের কি এত বিশাল দাবী ছিল ? কত বড় দাবী ছিল তাদের ? দিনে ৮ ঘন্টা শ্রমের যৌক্তিক দাবী তুলেছিলেন তারা। একটি স্বাধীন দেশে এ অধিকারতো শ্রমিকদের আন্দোলন করে পাওয়ার কথা ছিল না। কথা ছিল না স্বাধীন দেশের শ্রমিকদের রক্তে রাজপথ লাল হয়ে যাওয়ার। কথা ছিল না শুধু মাত্র ছোট্ট একটা দাবীর জন্য নিরপরাধ শ্রমিকদেরকে গুলিতে বুক বিদীর্ন করার। নিষ্ঠুরতা সেখানেই থেমে ছিল না। ফাঁসিতে ঝুলিয়ে নির্মমভবে হত্যা করা হয়েছিল আরও ৭ জন অসহায় শ্রমিককে। এটা কি কোন দেশের সা¦ধীনতার ন্যায্য সুফলতা হতে পারে ? পৃথিবীর তাবত স্বাধীন দেশের শ্রমিকরা এখনও কি স্বাধীনতার সুফলতা পেয়েছে ? পেয়েছে কি তাদের স্বাধীনতার প্রাপ্য ন্যায্য অধীকার ? আজও সারা বিশ্বের শ্রমিকদেরকে বড় মানবেতর ভাবে জীবন কাটাতে হয় মুখ বুজে। মালিক-শ্রমিকের পার্থক্য আজও আকাশ পাতাল দুরত্বে সীমা রেখা টানা। মুৎসুদ্ধি মালিক শ্রেনী চিরকালই শ্রমিকের রক্ত চুষে খেয়ে আঙ্গুল ফুলে কলা গাছ এবং অনেকে আবার কলা গাছ ফুলে বট গাছে রূপান্তরিত হচ্ছে। আর সেই বটগাছ হওয়ার নিছিদ্র নিরাপত্তা দিচ্ছে পুঁজিবাদী সরকার। আর তারই উল্টো দৃশ্যপটে দিন মুজুর ও অপুষ্টি রোগ ক্লিষ্টতায় হাড্ডিসার দেহের শ্রমিকদেরকে বাধ্য করা হয় স্বাধীনতার বিজয় গান গাওয়ানোর জন্য। প্রশ্ন চিরদিন একটাই। সেটা হলো কেন সীমাহীন আকাশের চেয়েও বেশী বিশালতার মত এ বৈষম্য ? তামাম পৃথিবী না ঘুরে শুধু বাংলাদেশের শ্রমিকদের কথা বলি। আজ বাংলাদেশের ভোগী শ্রেনী এত ভোগ বিলাস করছে কিসের উপর দাঁড়িয়ে ? এত দামী গাড়ী এত বিলাস বহুল বাড়ী, সম্পদের এত বড় হিমালয় সম পাহাড় কোথা থেকে এসেছে ? সবই ঐ শ্রমিক শ্রেনীর তাজা রক্তের ঘামে চুরি করা মুজুরী মুল্যের নির্লজ্জ বিলাসিতা। আমরা জানি পৃথিবীর সর্বনিম্ন এবং একেবারে নামমাত্র মুল্যে এদেশের গার্মেন্টস শ্রমিক রাতদিনে প্রায় ১৬ থেকে কখানো কখনো ১৮ ঘন্টা পর্যন্ত কাজ করে থাকে। আর প্রতি বছর স্বার্থবাদী সব রাজনৈতিক নেতাদের গাল ভরা মিথ্যা মদদে ঘটা করে আন্তর্জাতিক মে’ দিবস পালন করে তারা। সেকি রঙ বাহারী মহা জৌলুসী আয়োজন। মনে হয় তাদের দাবী পূরন হওয়ার বিষয় যেন একেবারে দোর গোড়ায় এসে আনান্দ প্রদীপ জ্বালিয়ে আপেক্ষা করছে। কিন্তু আজও আমাদের দেশের বেসরকারী খাতের শ্রমিকদের বেতন কাঠামো সরকারী নীতিমালার সঠিক স্লাভে নির্ধারন করা সম্ভবপর হয় নাই। শুধু সর্বনিম্ন বেতন কাঠামো প্রস্তুত করে অস্থায়ী একটি লোক দেখানো বিধিমালা প্রস্তুত করা হয়েছে মাত্র। স্বাধীনতার ৪৯ বছর পর শ্রমিকদের কী এই রকমের বৈষম্যপুর্ন পাওনা পাওয়ার কথা ছিল ? প্রকৃত পক্ষে ঐ নীতিমালার কোন বাস্তব কার্যকারিতা আজও আলোর মুখ দেখতে পায় নাই। দেশের বেশীর ভাগ গার্মেন্টস-এ দুই/তিন হাজার টাকা বেতনে লক্ষ লক্ষ শ্রমিক আজও প্রায় ১৮‘ঘন্টা করে শ্রম দিয়ে যাচ্ছে। সে সকল শ্রমিকদেরকে প্রশ্ন করলে তারা বলতে বাধ্য হবে তাদের সর্বনিম্ন বেতন তিন হাজার টাকার উপরে। কারন তাদের চাকুরী যে একেবারেই অস্থায়ী বালির বাঁধ। বৃষ্টি নয় একটু চোখের পানি পরলেই বালির বাঁধটি নিমিষেই ভেঙ্গে যাবে। বেকার হয়ে মারা যাবে লক্ষ লক্ষ শ্রমিক। গার্মেন্টস শ্রমিকদের চাকুরীর একচুল পরিমানেও কোন নিশ্চয়তা নাই। চাকুরীতে কোন আইনের বালাই নেই। আজ আছেতো কালকেই চাকুরী নেই। কেন নিশ্চয়তা নেই ? কারন এ ব্যাপারে সরকারের কোন যুগোপোযোগী বিধিবদ্ধ নীতিমালাই গঠিত হয় নাই। মালিক রেগে গেলে শুধু বলবে যে তুমি কাল থেকে আর কাজে এসো না। ব্যাস চাকুরী ডিসমিস। কাজেই বাস্তবে এক হাজার টাকা বেতন নিয়ে তিন হাজার টাকা বেতনের কথা বলতেও সে বাধ্য থাকে। না হলেতো বুঝতেই পারছেন। আমাদের দেশের সংবিধানে কৃষক-শ্রমিকের জন্য সুষ্পষ্ট কোন অধিকার রেখে কোন অনুচ্ছেদ সন্নিবেশিত করা হয় নাই। কেউ কেউতো সংবিধানের এই অনুচ্ছেদ বিহীন ব্যর্থতার কথা বলে পান্ডিত্য দেখাচ্ছেন না। এখানেইতো শুভঙ্করের ফাঁকি-মিয়া সাহেবরা এখানেইতো শুভঙ্করের ফাঁকি। তবে শুধু মাত্র সংবিধানের ১৪ নং অনুচ্ছেদ-এ বলা হয়েছে “রাষ্ট্রের অন্যতম মৌলিক দায়ীত্ব হইবে মেহনতি মানুষকে-কৃষক ও শ্রমিককে এবং জনগনের অনগ্রসর অংশ সমুহকে সকল প্রকারের শোষন হইতে মুক্তি দান করা”। কিন্ত দেশের অসহায় শ্রমিকরা কি রক্ত চোষা মালিক শ্রেনীর শোষনের হাত থেকে সংবিধানের প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী আদৌ মুক্তি পেয়েছে ? কিংবা এদেশের শ্রমিকদের মুক্তি পাওয়ার আদৌ কি কোন সম্ভাবনা আছে ? শ্রমিক শ্রেনীর এ শোষন বঞ্চনা হাজার হাজার বছরের কলঙ্ক জনক ইতিহাস। ১৮৮৬ সাল থেকে ২০২০ সাল। এখানোও একশত চৌত্রিশ বছর অতিক্রান্ত হয়েছে। এই একশত চৌত্রিশ বছরের মধ্যে শ্রমিকদের ভাগ্যের তেমন কোনই পরিবর্তন হয় নাই। আজও দেশের সাধারন শ্রমিক শ্রেনী বড় মানবেতর জীবন যাপন করে। আজও সেই একই অনিশ্চিত অতল তিমিরে পরে আছে শ্রমিক শ্রেনী। কিন্ত রাজনীতির সস্তা মসল্লা হিসাবে প্রতি বছরই আমরা দেখতে পাই যে শ্রমিকদের রক্ত চোষারাই অনেক ঘটা করে ১‘লা মে অর্থাৎ মে’ দিবস বড় ধুমধাম করে পালন করাচ্ছে। কেন পালন করাচ্ছে ? কারন শ্রমিকদের শান্ত করে রাখার ঐ একটি মাত্র দিন। আমাদের দেশের বেসরকারী কোন শ্রমিকেরই ভবিষৎ বলে কোন ব্যবস্থা নেই। চাকুরী শেষ তো সব শেষ। প্রকৃতপক্ষে কোন পেনশনের ব্যবস্থা নেই কিংবা নেই অবসর জীবনে চলার জন্য অন্য কোন সুব্যবস্থাপনা। শুধু খাতায় কলমে দেশ স্বাধীন ছিল আমেরিকাতেও। কিন্ত্র শ্রমিকদের কোন স্বাধীনতা ছিল না। ছিল না সাংবিধানিক কোন সুনিশ্চিত অধিকার। ১৭৭৬ থেকে ১৮৮৬ সাল। আমেরিকার স্বাধীন দেশের মাঝে পরাধীনতার শক্ত শৃঙ্খলে এ ভাবেই কেটেছে ১১০টি বছর। এর পর অর্থনীতির কোন স্বাধীনতা নয়,শুধু মাত্র কাজের সময় নির্ধারন থাকার স্বাধীনতার কথা বলাতে চালানো হয় পরাধীনতার সেই স্বৈরাচারী ষ্টিম রোলার। গুলি করে ঝাঁজরা করে দেওয়া হয় অসহায় শ্রমিকের বুকের পাঁজর। এখানেই শেষ নয়। শ্রমিকদেরকে ভীতসন্ত্রস্থ করে নিয়ন্ত্রনে রাখার জন্য ৭‘জন শ্রমিককে প্রাকাশ্যে ফাঁসিতে ঝুলিয়ে দেখানো হয় স্বাধীনতা চাওয়ার প্রায়শ্চিত্ত কত নির্মম কত ভয়াবহ!! এভাবেই কেটে যাচ্ছে আরও একশত চৌত্রিশাটি বছর। কোনই পরিবর্তনই নেই। শ্রমিকরা আশায় বুক বেঁধে শুধুই মরিচিকার পেছনে দৌড়াচ্ছে মাত্র। শ্রমিক যে ভাবে দৌড়াচ্ছে সীমানা ছোঁয়ার প্রত্যয় নিয়ে, ঠিক সৌভাগ্যের সীমানাও সরে যাচ্ছে দুর নীলিমার অসীমতার দিকে। এইতো সেদিনের কথা। তাজরিন গার্মেন্টেস-এ কিভাবে চোখের সামনে জ্বলেপুড়ে ছাই হয়ে গেল শতশত শ্রমিকের বড় অবহেলার জীবন। ষ্পেকট্রাম গার্মেমেন্টস-এর ধ্বংস স্তুপে কান পাতলে আজও শত শত শ্রমিকের ক্রন্দন শোনা যায়। আর সাভার ট্রজেডিরতো কোন ব্যাখ্যা দেওয়ার উপায় নেই। নেই সামান্যতম শান্তনা দেওয়ার নুন্যতম কোন ভাষা। পৃথিবীর সকল ভয়াবহ এবং নির্মম জীবনহানীকে হার মানিয়েছে সেদিনের সেই সাভার ট্রজেডি। ২৪শে এপ্রিল ২০১৩’ বুধবার বাংলা ১১‘ই বৈশাখ। বাংলাদেশের তথা সমগ্র পৃথিবীর শ্রমিকদের জন্য আরেকটি মে দিবস সৃষ্টি হয়ে রয়েছে ইতিহাসের নতুন পাতায়। আর কত পথ হাঁটতে হবে শ্রমিকের ন্যায্য অধিকার পেতে ? আর কত শ্রমিকের জীবন উৎস্বর্গ করতে হবে বলে দাও। আর কত রক্ত দিলে শ্রমিকের শত জনমের প্রায়শ্চিত্ত শেষ হয়ে যাবে ? অথবা শ্রমিকদের কি কোন মুক্তি নেই ? হ্যাঁ , পৃথিবীতে দাস প্রথা বিলুপ্তকারী আব্রাহাম লিংকনের মত আরেকজন লৌহ মানবের জন্ম নিতে হবে। ভেঙ্গে চুরমার করে দিতে হবে মুৎসুদ্ধি মোড়লদের অচলায়তন। আমরা একদিন মুক্ত হবই হব। জীবন যুদ্ধের জয় আমাদের সুনিশ্চিত। বিজয়ী হোক বিশ্বের সকল মেহনতি মানুষ। বিজয়ী হোক পৃথিবীর শ্রমজীবী মানুষ।