রাজবাড়ী, ১২ই অগ্রহায়ণ, ১৪২৯ বঙ্গাব্দ, রোববার, ২৭ নভেম্বর ২০২২

লকডাউন: কতদূর আর কতদূর

প্রকাশ: ২০ এপ্রিল, ২০২০ ৮:১৭ : অপরাহ্ণ

প্রিন্ট করুন

করোনা সংক্রমণ ঠেকাতে ও জনগণকে নিরাপদে রাখতে গত ২৬ মার্চ থেকে দেশে সাধারণ ছুটি ঘোষণা করেছে সরকার। কয়েক দফায় এ ছুটি বাড়িয়ে ২৫ এপ্রিল পর্যন্ত করা হয়েছে। যা আরও বাড়তে পারে বলে শোনা যাচ্ছে। ছুটি ঘোষণার পর থেকে বন্ধ রয়েছে যান চলাচল।

এ অবস্থায় ‘অলস’ ঘরে বসে থাকা লোকজনের মনে প্রশ্ন উঠেছে কবে থেকে আবার স্বাভাবিক চলাচল করতে পারবেন তারা।  কারও কারও মনে হচ্ছে, ঢাকা কতদূর! অনেকেই হাঁপিয়ে উঠেছেন, মনে মনে বলছেন, স্বস্তির দিন ‘কতদূর আর কতদূর?’

দেশে করোনাভাইরাসের বিস্তারের বিষয়ে ভাইরোলিজ বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এটি এখন কমিউনিটি ট্রান্সমিশন পর্যায়ে চলে গেছে। আর এ ভাইরাসের যেকোনো পরিবেশে অ্যাডপ্ট করার সক্ষমতা থাকায় বেশি ক্ষতিকরও। ফলে ট্রান্সমিশন লেভেল শূন্যের কোটায় না আসা পর্যন্ত লকডাউন অথবা শারীরিক ও সামাজিক দূরত্ব নিশ্চিতের বিষয়গুলো কঠোরভাবে মানতে হবে।

এদিকে বাংলাদেশ ও ভারতের প্রেক্ষাপটে ক্যামব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয়ের একটি গবেষণা বলছে, করোনাভাইরাস নির্মূলে ২১ দিনের লকডাউন কার্যকর হবে না। ২১ দিন পর এটি আরও ক্ষতিকর হয়ে আসতে পারে। এক্ষেত্রে তারা লকডাউন আরও বাড়ানোর পরামর্শ দিয়েছেন।

সোমবার (২০ এপ্রিল) ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ (ঢামেক) হাসপাতালের ভাইরোলজি বিভাগের বিভাগীয় প্রধান অধ্যাপক ড. সুলতানা শাহানা বানু বলেন, প্রাকৃতিকভাবে ভাইরাস দেড় দুই মাস পার হলে মানবদেহে অ্যান্টিবডি গ্রো করে যায়। তখন ভাইরাসের সংক্রমণ কমে যায়। করোনাভাইরাসের ক্ষেত্রে কিন্তু তা হচ্ছে না।  দেখা যাচ্ছে যে বিভিন্ন দেশে দুই থেকে তিন মাস পর্যন্ত হয়ে আস্তে আস্তে কমছে। যেমন ইতালিতে বা ওয়েস্টার্ন দেশগুলোতে একটু একটু কমে আসছে। এখনো ওভাবে বলা যাবে না কমে যাচ্ছে; কারণ এখনো  মারা যাচ্ছে, আক্রান্ত হচ্ছে। কিন্তু কমছে। আশার কথা হলো, এখন পর্যন্ত দেখা যাচ্ছে ভাইরাসটি নতুন একটি দেশে গিয়ে দুই থেকে তিন মাসে কমতে শুরু করে।

তিনি বলেন, ভাইরাস লিভিং সেল ছাড়া বাঁচতে পারে না। পরিবেশে থাকলে দুই ঘণ্টা থেকে নয় দিন পর্যন্ত এটি বাঁচতে পারে। ধরে নিলাম ১৫ দিন বাঁচলো। এর বেশি বাঁচতে পারবে না। মরে যাবে একসময়। কিন্তু সে যদি লিভিং সেল পায় তখন সে মাল্টিপ্লাই করেই যাবে। বাংলাদেশে কমিউনিটি ট্রান্সমিশন হয়ে গেছে। ট্রান্সমিশন স্টপ না করা পর্যন্ত লকডাউন রাখতে হবে। অন্তত সোশ্যাল ডিস্টেন্স বা ফিজিক্যাল ডিস্টেন্স রাখতে হবে।

অধ্যাপক ড. সুলতানা শাহান বানু বলেন, ‘করোনাভাইরাস যখন এক পরিবেশ থেকে অন্য পরিবেশে যায় তখন তারা নতুন পরিবেশকে অ্যাডপ্ট করে নিতে পারে। অ্যাডপ্ট করার সময় তাদের মধ্যে নিউট্রেশন হয়, তাদের মধ্যে যে জেনেটিক সিকুয়েন্স হয় সেগুলো পরিবর্তন হয়ে যায়। ফলে নতুন পরিবেশে গেলে আরও ক্ষতিকর হয়ে যেতে পারে।   ভাইরাসের ক্ষেত্রে দেখা যায় জেনেটিক পরিবর্তনের সময় মারা যায়।  কোনো কোনো ক্ষেত্রে দেখা যায় ভাইরাস পরিবর্তনের সময় যেমন ভয়ঙ্কর ছিলো তার চেয়েও বেশি ভয়ঙ্কর হয়ে যায়। করোনাভাইরাসের ক্ষেত্রে দেখা যাচ্ছে ভয়ঙ্কর থেকে আরও ভয়ঙ্কর হচ্ছে। কারণ করোনাভাইরাসের নিউট্রেশন রেঞ্জ যেমন বেশি, ক্ষতিকরও তেমন বেশি। কারণ এটা দ্রুত অ্যাডজাস্ট করে নেয়।’

অন্যান্য দেশে দুই থেকে তিন মাসের মধ্যে একদম বন্ধ না হলেও আক্রান্ত রেট কমছে। সে বিবেচনায় অন্তত সেই সময় পর্যন্ত যেন লকডাউন রাখার পরামর্শ দেন তিনি।

বাংলাদেশ ও ভারতের প্রেক্ষাপটে করা ক্যামব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয়ের এক গবেষণায় ৪৯ দিন অথবা তিন মেয়াদে ৬৭ দিন লকডাউনের পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। ওই বিশ্ববিদ্যালয়ের অ্যাপ্লাইড মেথমেটিক্স বিভাগের গবেষক রানজয় অধিকারী ও থিওরিক্যাল ফিজিক্সের গবেষক রাজেশ সিং গবেষণা করে কার্যকরী এ পরামর্শ দেন। সেখানে তারা বলেছেন, কঠোরভাবে ৪৯ দিন অথবা তিন দফায় যথাক্রমে ২১, ২৮ ও ১৮ দিনের লকডাউন দিতে হবে। তিন দফায় দেওয়া লকডাউনে বিরতি হিসেবে মাঝে পাঁচ দিন রাখা হবে। এতে করোনাভাইরাস নির্মূল করা যাবে।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের আরেক ভাইরোলজিস্ট বলেন, করোনা ট্রান্সমিশন রুখতে হলে আরও বেশি সিরিয়াস ও কঠোর হতে হবে। অনেক জায়গায় এখনো টেস্ট হচ্ছে না। গ্রামে-গঞ্জে স্বাভাবিক বা অস্বাভাবিকভাবে যারা মারা যাচ্ছে তাদেরও করোনা টেস্ট করা উচিত। কারণ এর মাধ্যমেও করোনা ছড়াতে পারে। পরীক্ষা করা ছাড়া যেগুলো কবর বা সৎকার করা হচ্ছে সেগুলোকে করোনা ধরে নিতে হবে।

লকডাউন থেকে স্বাভাবিক পর্যায়ের দেশ কবে আসতে পারে এ বিষয়ে পুলিশের পক্ষ থেকে কোনো বক্তব্য দেওয়া হয়নি। তবে সদরদপ্তরের জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা জানান, সরকার যতদিন চাইবে ততদিন পুলিশের পক্ষ থেকে লকডাউন, সামাজিক দূরত্ব নিশ্চিতে কাজ করবে।