রাজবাড়ী, ১০ই আশ্বিন, ১৪২৮ বঙ্গাব্দ, শনিবার, ২৫ সেপ্টেম্বর ২০২১

আষাঢ়ে গল্প ———–এডঃ লিয়াকত আলী বাবু

প্রকাশ: ১৮ এপ্রিল, ২০২০ ৮:০১ : অপরাহ্ণ

 

বিলাত আলীর বউয়ের নাম বিউটি বেগম। খুবই বদ মেজাজী এবং বেকায়দা স্বভাবের বউ। শুধু নামেই বউ‘টির নাম বিউটি। আচরন’টা একেবারেই বিউটিহীন। বিলাত আলীর কপালে আজ কী যে লেখা আছে তা একমাত্র আল্ল¬াহ পাকই জানেন। বিউটি বেগমের রক্তরাঙা চোখের পাশাপাশি বেঁকি বেড়ার কোনায় লুকাইয়া রাখা বকুল কাঠের বাটামের ভয়ানক ছবিটি বিলাত আলীর চোখের সামনে বারবার ভাসিয়া উঠিতে লাগিল। কোন্ কুলক্ষনে যে গতরাতে মেঘলা সাঁঝে গুঁড়ি গুঁড়ি বৃষ্টির মাঝে বোয়ালডাঙ্গির বিল্ললের বাড়ীর বারান্দায় বসিয়া টুয়েন্টি নাইন খেলিতে গিয়া টুয়েন্টি ফোর আওয়ার্স পার হইয়া গিয়াছে তাহা বিলাত আলী ঘুনাক্ষরেও ঠাওর করিয়া উঠিতে পারে নাই।
আচ্ছা কনতো দেহি,এ’কি আর কেউ ? সে হইল গিয়া বিলাত আলীর দশ নাম্বারী সংকেতধারী বাটাম ভাঙ্গা দজ্জাল বউ। বিলাত আলী যতই বাড়ীর দিকে আগাইয়া যাইতেছে ততই তাহার মুখ শুকাইয়া একেবারে পাংশু বর্ন হইয়া যাইতে লাগিল। হার্টের বীট বাড়িয়া একশো দশ। আজ যে আবার কোন অজুহাতে বউ’য়ের কাছে ইজ্জত রক্ষা করিবে তাহা বিলাত আলী কিছুতেই গুছাইয়া উঠিতে পারিতেছে না। হঠাৎ বিলাত আলী পা‘য়ে একটা হোঁচট খাইয়া দাঁড়াইয়া পরিল। তাঁহার কান দুইটি খরগোশের মত খাড়া হইয়া গেল। পথে বাধা পরিল কেন ? তা হইলে কপালে কী আজ শনির দশা’র যোগ টোগ আছে নাকি ? কিন্তু সকাল বেলায় ইত্তেফাকের রাশির ঘরে লেখা ছিল অদ্য অর্থ প্রাপ্তির যোগসহ দিনের শুরুতে রোমাঞ্চ শুভ। নাহ্ এত ভয় পাইলে কী পুরুষ মানুষের কোন ইজ্জত সন্মান থাকে নাকি ? বিলাত আলী বুক টান করিয়া দুই হাতের আঙ্গুল ফুটাইয়া ‘পুরুষ ডরে না কভু ভিক্ষারী নারীতে’ ভাব দেখাইয়া আল্ল¬ার নাম লইয়া বাড়ির বেঁকি বেড়ার মধ্যে ঢুকিয়া পরিল।
বেঁকি বেড়ার মধ্যে ঢুকিয়াই তাহার চক্ষু যুগল স্থির হইয়া গেল। কলিজাটাও একেবারে বিদ্যুৎ চমকানোর মতই চমকিয়া উঠিল। ‘যেখানে বাঘের ভয় সেখানেই রাত হয়’-এর মত ঘটনা। বাঘিনী বিউটি বেগম তাঁর একেবারে মুখোমুখি অবস্থায় বারান্দায় দাঁড়াইয়া আছে। বিলাত আলীকে দেখিয়াই বউ সিংহি’র মত গর্জন করিয়া উঠিল। বলি গতরাতে কার গোয়ালে গিয়া গরু পাহাড়া দিছস ? এতই যখন বাইরে বাইরে রাত কাটানোর সখ তখন আর বাড়ীতে আইসা লাভ কী ? পাড়ায় পাড়ায় পাহারা দিয়া বেড়াইলেইতো চৌকিদারীর চাকুরীতে চান্স পাইয়া যাইতা। বিলাত আলীর বউয়ের বেষট্টি বগর বগর যেন আর থামিতে’ই চায় না। ও’দিকে বিলাত আলীর মাথাতেও বুদ্ধির নাগরদোলা ঘুরপাক খাইয়া চলিয়াছে। কোন কথা দিয়া আজ কাইত করা যায় বিউটি‘কে তাহা কিছুতেই মগজের মধ্যে আসিতেছে না। বিলাত আলী আস্তে আস্তে বউয়ের দিকে আগাইয়া যাইতে যাইতে বলিতে লাগিল ‘তোমার ভাই’তো একেবারেই নাছোর বান্দা’। ওদিকে তোমার মা‘য়ের শরীরটাও খুব একটা ভাল যাতিছিলো না। বাতের ব্যথাটাও খুব বাইড়ে গেছিলো। আহা‘রে আম্মাজান কী কষ্টটাই না পাতিছে। বিলাত আলীর কথায় জ্বলন্ত উনুনে’র মধ্যে যেন এক বালতি ঠান্ডা পানি ঢালিয়া পড়িল। বিলাত আলীর বউয়ের মুখে আর কথা নাই। আহা স্বামী বাছাধন আমার বলে কী ? সে কিনা তার বাপের বাড়ীতে গিয়াছিল ? বিলাত আলীর বউ বিউটি বেগমের মুখটা লজ্জায় একেবারে আলতা রাঙা হইয়া গেল। হ্যাঁগো,বলা নাই কওয়া নাই তুমি আমাদের বাড়ীতে গেছিলা ক্যান ? বিলাত আলীর সহাস্য উত্তর, হাজার হোক শাশুরীতো মায়ে’র মতই,না কী কও ? আম্মাজানরে দেখতে যাইতে হয় না ? আত্বীয়তার সম্পর্ক টম্পর্ক কী দুনিয়ারতে একেবারে উঠে যাতিছে নাকি ? বিউটি বেগম’তো স্বামীর কথা শুনিয়া খুশিতে একেবারে গদ্গদ্। ওগো আমাগো বাড়ীতে যাতি কালে তোমার খুব কষ্ট হইছে না ? আমারে বাড়ি যাতি যে ‘খাল-খন্দক’ মার্কা রাস্তা। বিলাত আলীর বউ’য়ের তেল তেলানো কথা শুনিয়া বিলাত আলী যেন কিছুটা হইলেও হাফ ছাড়িয়া বাঁচিল। বিলাত আলী মনে মনে ভাবিতে লাগিল, যাই হোক এ যাত্রায়’তো মনে হতিছে বাঁচা যাবিনি। এক কষাতেই বউ আজ কাইত হইয়া পরছে। এই কথা ভাবিতে ভাবিতে বিলাত আলী ন্যাচাৎ করিয়া বারান্দার কোনায় গিয়া বসিয়া পরিল। এদিকে বিউটি বেগম এক দৌড়ে হাত পাখাটা আনিয়া স্বামীকে বাতাস করিতে করিতে জিজ্ঞাসা করিল ‘ওগো কোন পথে কেম্বা করে আমাগো বাড়ীতে গেছিলা’? বিলাত আলীর বেকায়দা ধরপড়ানি ভাব তখনও কাটে নাই। বউ’তো রীতিমত উকিলের মত জেরা করিতে শুরু করিয়া দিল। বিলাত আলী বলিল,আরে বাবা সে এক বিশাল ঘটনা। তোমাদের বাড়ীতে সোজা পথে যাওয়ার’তো কোন সুযোগ’ই ছিল না। শশুর বাড়ী যাতি গিয়ে আমার জীবনটা নিয়েই’তো টান পারাপারি শুরু হয়ে গেছিলো। বিলাত আলীর বউ মুখে কাপড় টানিয়া ওমা ! শব্দে চোখ গুল্ল¬াইয়া বলিয়া উঠিল, কও কী গো ? তোমার জান নিয়া আবার টানাটানি করছে কিডা ? বিলাত আলী তাহার পকেট হইতে একটা বিড়ি বাহির করিয়া ঠাস করিয়া ম্যাচ জ্বালাইয়া মহা বীরত্বের সাথে বিড়ি ধরাইয়া বলিতে লাগিল, কাল হাটের’তে আম্মাজানের জন্যি ধনন্তরী ‘মান্ডার মালিশ’ কিনে নিয়ে সন্ধ্যে বেলা দত্ত বাড়ীর রাস্তাা দিয়ে তোমাগো বাড়ী যাতিছিলাম। ভারী আঁধারে একটা ভাব। হঠাৎ জঙ্গলের কোনায় খচ্ মচানো শব্দে পেছনে ফিরে দেখি বাঘের মত বেকায়দা সাইজের এক বাঘদাসা ওৎ পাইতে বসে আছে। আঁধো আঁধো অন্ধকারে ওটা বাঘ না বাঘদাসা সিডা কিছুতেই বোঝা যাতিছিলো না। শেষে মনে হইলো ঐডে এটা চিতে বাঘ। বলো’তো বউ তখন কী আর জান আমার ধরে ছিলো ? পরি কি মরি করে অমনি ভৌঁ ভৌঁ কইরে দৌড় পারা শুরু করে দিলাম। বাঘও বসে থাইকলো না। বাঘও আমার পাছে পাছে দৌড় পারা শুরু করে দিলো। আমিও দৌড়,বাঘও দৌড়। কিন্তু দেখলাম বাঘ আমার পাছ ছাড়তিছে না। আমি দৌড়’তি দৌড়’তি যখন হাঁফায়া গেলাম তখন বুদ্ধি করে দত্ত বাড়ীর পুকুর চালার তাল গাছ বাইয়া গাছের একেবারে মাথায় উঠে গেলাম। শালার বাঘও কী পাঁজি কম ? একেবারে হাড় বজ্জাতে বাঘ। শালার বাঘ প্রথমে তাল গাছ বাইয়ে উঠার চেষ্টা করে উঠতি পাইরলো না। তারপর শালা তালগাছ ধরে ঝাঁকাঝাঁকি শুরু করে দিল। কউ’তো বউ তালগাছ ধইরে ঝাঁকাঝাঁকি করলি কী গাছে বসে থাকা যায় ? তেমু তালের বাগড়ো ধরে ঝুলে থাকলাম। নিচে বাঘের দিকে তাকায়ে আমি মাঘ মাসের শীতের মত ঠক ঠক করে কাঁপতি লাগলাম। জানে আর পানি ছিল না আমার। তাকাইয়া দেহি বাঘের চোখ টচ লাইটের মত জ্বল জ্বল করতিছে। তারপর বাঘের চোখে চোখ পরতিই আমার তল পেটের জল কল কল করে বাড়োয়ে পড়তি লাগলো। কউ’তো বউ,ইডা এটা লজ্জার কথা না ? লজ্জা শরম পইরে মরুক। ঘটনাতো আরও খারাপ হয়ে যাতি লাইগলো। শালার বাঘ দেখি আমার কল কলানো জল বাইয়ে উপরে উঠে আসতিছে। আমি তাড়াতাড়ি হাত দিয়ে জলের কল চাইপে ধরলাম। জলের কল চাইপে ধরার পর বাঘটা মধ্যি পথে আইসে ধবাস করে পরে গেল। শালা পরে যাইয়া মনে হলো আরো ক্ষেপে গেল বাঘ। বাঘের সে কী রাগ। গুরুম গুরুম শব্দে লেজ বাইড়েতি বাইড়েতি তাল গাছের গোড়া খুরতে শুরু করে দিল। কউ’তো বউ তখন জানে কী আর পানি থাকে ? বিলাত আলীর বউ ঐ কথা শুনিয়া চোখ কপালে তুলিয়া মুখে হাত ঠেকাইয়া বলিয়া উঠিল, ওমা ! ‘কও কী গো ? এ তুমি কি কতিছো ? তারপর কী হইলো কওতো ? বিলাত আলী আরেকটা বিড়ি ধরাইয়া এক গাল ধুঁয়া ছাড়িয়া বলিতে লাগিল, তখন তার কী আর কোন পর ছিল‘রে বউ ? আস্তে আস্তে তালগাছ কাইত হওয়া শুরু হয়ে যাতি লাগলো। শালার বাঘ তাল গাছ কাইত হওয়া দেখে আরও জোড়ে জোড়ে মাটি খুড়তি লাইগলো। আমিও শেষ কলেমা পড়ে নিলাম। তোমার সাথে আর শ্যাষ দেখাটা হবিনে এই জন্যি খুউবই খারাপ লাগতিছিলো। কিন্তু আমারতো আর কোন দোষ নাই। না কী কউ ? স্বামী বিলাত আলীর কথা শুনিয়া বিউটি বেগম পাথরের মুর্তির মত একেবারে শক্ত হইয়া যাইতে লাগিল। এরপর বউ বিউটি বেগমের শরীরের সকল লোম একেবারে সজারুর কাঁটার মত খাড়া হইয়া উঠিল। এরপর আতঙ্কিত কন্ঠে জিজ্ঞাসা করিল, ‘হায় আমার কপাল,তারপর’? তারপর কি হলো ? তারপর বিলাত আলী তার হাতে থাকা জ্বলন্ত বিড়িটাতে একটা লম্বা সুখটান দিয়া বিড়িটা পায়ের নিচে চাপা দিয়া এক বুক শ্বাস টানিয়া বলিতে লাগিল, ‘শোন বউ, যখন তাল গাছটা মড় মড় করে উপড়ে পরতি লাইগলো তখন আমি,জোড়ে জোড়ে আল্ল¬ার নাম নিয়ে চোখ বন্ধ করে ফেললাম’। হায় আল্লাহ কী কও ? এতো দেহি ডাহাতে কথা ! শেষে কী হলো ? নাগো বউ না,শ্যাষে বাঘ আর আমারে ধরতি পারে নাই। তাল গাছটা ধবাস করে পরার পরই আমি মাজায় খুব ব্যথা পালাম। মাজা একেবারে ফাইটে যাওয়ার মত অবস্থা। কিন্তু চোখ তাকায়ে দেহি আমি তোমাগোরে একেবারে উঠোনোর উপর যাইয়া পড়ছি। তোমার ভাই’তো দৌড়ো আইসে আমারে একেবারে জড়ায়ে ধরলো। ও’দিক আম্মাজানের মুখিতো কোন কথাই নাই। মনে কর যে ও’গের কথাতো এখনো আমি ভুলতি পারতিছিনে। আব্বাজান, আম্মাজান, মিয়ে ভাই,তারপর তোমার ছোট বোন বাতাসী আমারে একেবারে জোড় করেই আটকায়ে রাইখলো। সে কী আদর যতœ। মনে কর যে খোপের’তে মুরগী বাইর করে ঐ রাত্রিই জবাই করে ফেললো। আচ্ছা কওতো তাজা জান! এ কি সহ্য করা যায় ? জবাই করার পরও মুরগীডা লাফাতি লাইগলো। যাক জামোই জুমরা’রা শশুর বাড়ী গেলি ওমন আদর খাতির পাইয়াই থাকে, না কী কও ? আচ্ছা কওতো দেখি অমন আদর খাতির ফেলাইয়ে থুয়ে ক্যাম্বা চলে চলে আসি ? না কী চলে আসা ঠিক ? বাবার ঐ রকম আজগুবি গল্প শুনিয়া বিলাত আলীর ছোট ছেলেটা পড়ার টেবিল হইতে উঠিয়া আসিয়া হাসিতে হাসিতে বলিতে লাগিলত,‘আব্বা,এত সুন্দর আষাঢ়ে গল্প যখন তুমি বলতিই পার, তাহলি রম্য রচনা লেখা শুরু করলি হয় না ? ভাল কাটতি হবিনি। মুহুর্তের মধ্যেই বিলাত আলীর মুখ ফ্যাকাসে হইয়া উঠিল। বউ বিউটি বেগম’তো প্রায় বারোআনা পটিয়াই গিয়াছিল। চার আনায় ভ্যাজাল বাধাইয়া দিল না-লায়েক ছোট ছাওয়াল। বিলাত আলী বারুদের মত জ্বলিয়া বলিয়া উঠিল ঃ হারামজাদা,আষাঢ় মাসে আষাঢ়ে গল্প করবো নাতো আশ্মিনে গল্প করবো না কী ? বে-আক্কেল ছাওয়াল কন্কের যেন। এই কথা বলিয়া বিলাত আলী আরেকটি বিড়ি ধরাইয়া বিড়ি টানিতে টানিতে বেঁকি বেড়ার বাহিরে চলিয়া গেল।