রাজবাড়ী, ১১ই অগ্রহায়ণ, ১৪২৯ বঙ্গাব্দ, শনিবার, ২৬ নভেম্বর ২০২২

বাংলা বর্ষপঞ্জির সংক্ষিপ্ত ইতিহাস’——— লিয়াকত নাজির’

প্রকাশ: ১৪ এপ্রিল, ২০২০ ৭:১৮ : অপরাহ্ণ

প্রিন্ট করুন

 

বর্ষপঞ্জির জন্ম ৪৬১ বছর আগে।হিসাবটা দেখে প্রথমেই মনে একটা বিশাল খটকা লেগে যেতে পারে। তবে এ প্রবন্ধটা শেষ অবধি পড়লে খটকাটা হয়তো দুর হয়ে যাবে। আমরা বাঙালী এবং বাঙলা আমাদের মাতৃ ভাষা। সেই বাঙলায় বর্ষপঞ্জি থাকবে না তা কি হয় ? তবে বাংলায় বর্ষ গননার জন্য যিনি প্রথম উদ্যোগ নিয়েছিলেন তার নামটা বাঙলার ইতিহাসে স্বর্নাক্ষরে লেখা থাকা দরকার। তা না’হলে যে বাঙলার ইতিহাস অপূর্ন থেকে যায় । আর বাঙলা বর্ষপঞ্জি গননার ইতিহাসটা প্রত্যেক বাঙালীরই জেনে রাখা উচিৎ। তা না’হলে বাঙালীর স্বকীয়তায় খুত থেকে যাওয়ার কথা। যে ভাবে এবং যে কারনে বাংলা সনের প্রচলন করা হয়েছিল তার ইতিহাসটা সকল ঐতিহাসিক গনের মতামতেের মধ্যে (সামান্য কিছু হেরফের ছাড়া) ঐক্যমত্যের পরিচয় পাওয়া যায়। বাঙলা সনের প্রবর্তনের মধ্যে যেহেতু বড় ধরনের কোন মতানৈক্য নাই সেইহেতু ইতিহাসটা শতসিদ্ধ ভাবেই সুপ্রতিষ্ঠত হয়ে গেছে। তবে একটি যায়গায় সামান্য প্রশ্নবিদ্ধতা থেকে যায়। যেহেতু ফসলী সন হিসাবে বাঙলা সনের প্রবর্তন হয়েছিল বলে দাবী করা হয় কিন্ত দিল্লীর সম্রাট বাঙালী ছিলেন না এবং দিল্লী শাসনের সমগ্র অঞ্চলে বাংলা ভাষার প্রচলন ছিল না। শুধু দুই বাঙলায় এবং বিহার-উরিষ্যা ও আসাম-ত্রিপুরার কিয়দংশে বাংলা ভাষার প্রচলন ছিল। শুধু এই চার পাঁচটি জায়গার ফসলী মৌসুমের জন্য এবং খাজনা উত্তোলনের সুবিধার্থে বাঙলা পঞ্জিকার প্রচলন করাটা ঠিক ঐ ভাবে সামঞ্জস্য পুর্ন বলে মনে হয় না। ইতিহাসের পথ পরিক্রমানুযায়ী পানি পথের প্রথম যুদ্ধে বিজীত হয়ে ইং- ১৫২৩ সালে সর্ব প্রথম দিল্লীর সিংহাসনে আরোহন করেন মুঘল সম্রাট বাবর। তারই ধারাবাহিকতায় দিল্লীর সিংহাসনে স্থলাভিসিক্ত হন সম্রাট হুমায়ুন। আর হুমায়ুনের পরই ইং ১৫৫৬ সালের ১৪ ফেব্রুয়ারী তারিখে দিল্লীর সম্রাট হিসাবে অভিষিক্ত হন সম্রাট আকবর। সম্রাট আকবরই সর্ব প্রথম বাংলা বর্ষপঞ্জি প্রস্তুত করার তাগিত অনুভব করেন। শুরুটা ঠিক সেখান থেকেই। ঐ সময় দিল্লীতে একজন বিখ্যাত জ্যোতির্বিজ্ঞানী ছিলেন।তার নাম ছিল ফতেউল্লাহ্ সিরাজী।সম্রাট আকবর ফতেউল্লাহ্ সিরাজীর উপর বাংলা বর্ষপঞ্জি প্রবর্তনের দ্বায়ীত্ব অর্পন করেছিলেন । তখন হিজরী সালের ৯৬৩ হিজরী চলছিল। ফতেউল্লাহ্ সিরাজী হিজরী সনের সাথে বাংলা সাল সম্পৃক্ত করে বাংলা বর্ষপঞ্জি প্রবর্তনের চিন্তা করতে থাকেন। সেই হিসাবে ৯৬৩ বছর বয়সে বাংলা বর্ষপঞ্জির প্রথম জন্ম হয়। ৯৬৩ হিজরীতে আরবী বর্ষের প্রথম মাস মহররমের পহেলা তারিখে বাংলা হিসাবে ছিল পহেলা বৈশাখ । উল্লেখ্য যে বাংলা বর্ষপঞ্জির গননা না থাকলেও বাংলা বারো মাসের নাম খৃষ্ট জন্মের বহু পর্ব থেকেই চলমান ছিল। বাংলার প্রথম বর্ষ গননা হয়েছিল ৯৬৩ বছর বয়স যোগ করে নিয়ে। অর্থাৎ বাংলার প্রথম বর্ষই ছিল ৯৬৩ সাল। সেই হিসাবে এখন থেকে ৪৬১ বছর আগের থেকে বাংলা বর্ষ গননা শুরু করা হয়েছিল। ঐ ৪৬১ বছরের সাথ +৯৬৩ বছর যোগ করলে ১৪২৪ সাল হয় যা বর্তমানে চলমান আছে ।তবে প্রকৃত অর্থে বাংলা নববর্ষের প্রকাশ কাল ছিল তারও ২৯ বছর পর অর্থাৎ ইং ১৫৮৪ সালের ১০ই মার্চ তারিখ থেকে। কিন্তু ১৫৫৬ সালের সম্রাট আকবর পানি পথের ২য় যুদ্ধে বিক্রমাদিত্যকে পরাজিত করে ক্ষমতায় অভিষিক্ত হওয়ার বছরটাকে স্বর্নাক্ষরে স্মরন রাখার জন্য তিনি ২৯ বছর পেছনে চলে যান। আর সেই কারনে ১৫৫৬ সালের ১৪ ই এপ্রিল তারিখটা ১লা বৈশাখ মোতাবেক ১লা মহররম ৯৬৩ সাল হওয়ায় বৈশাখ মাসটাকে বাংলা বর্ষের প্রথম মাস হিসাবে গননা শুরু করা হয়। বাংলা নব বর্ষের আরেকটি বিশেষ দিক হল হালখাতা মহরত বা নতুন হিসাবের খাতা খোলা।আমাদের দেশে ব্যবসায়ীরা ইংরেজী হিসাবে নিত্যদিনের কাজ কর্ম পরিচালনা করলেও ব্যবসায়ী হিসাবটা পরিপূর্ন ভাবে বাংলাতেই পরিচালনা করে থাকে। আর এখন বাংলা নববর্ষই আমাদের আদি সংস্কৃতিতে উদ্ভাষিত করে তুলছে। তবে বাংলা নববর্ষের অনুষ্ঠান পালনেরও একটা ঠোট্ট ইতিহাস আছে। আর সেটা হল ১৯৬৫ সালে সর্ব প্রথম আনুষ্ঠানিক ভাবে ঢাকার রমনা বটমুলে ‘ছায়ানট’ পহেলা বৈশাখে বিশ্ব কবি রবীন্দ্র নাথ ঠাকুরের “এসো হে বৈখাশ এসো এসো” গানের মুর্চছনায় পথ চলা শুরু শুরু করেছিল। ১৯৬৬ সালে ডঃ মোহাম্মদ শহীদুল্লাহ বাংলা সন সংস্করের জন্য বাংলা একাডেমিতে একটা প্রস্তাবনা রাখেন।সেই প্রস্তাবনা গ্রহন করা হয়।বাংলা বর্ষে কোন লিপইয়ার ছিল না কিন্তু ড, মোহাম্মদ শহীদুল্লাহ সাহেবের সংস্কার অনুযায়ী চৈত্র ৩১ দিন করার জন্য আমাদের পূর্ব হিসাবের কিছু গড়মিল ঘটতে থাকে ।যার কারনে বাংলাদেশ ১৪ এপ্রিল পহেলা বৈশাখ পালন করলেও পূর্বের হিসাবে পশ্চিম বঙ্গে ১৫ ই এপ্রিল পহেলা বৈশাখ পালন করা হয়ে থাকে। অপরদিকে হিজরী বর্ষপঞ্জি চন্দ্র মাসের হিসাবে পরিচালিত হওয়ার কারনে ৩৫৪ বা ৩৫৫ দিনে হিজরী বছর পূর্ন হয়।কিন্তু বাংলা বর্ষ পূর্ন হয় ৩৬৫ দিনে। এই কারনে হিজরী সনের সাথে হিসাব গননা শুরু হলেও প্রতি হিজরী বৎসর ৩৫৪ বা ৩৫৫ দিনে বর্ষ পূর্ন হওয়ায় বাংলা বৎসেরর সাথে প্রতি নিয়ত গড়ে বছরে দশ দিনের পার্থক্য তৈরী হয়ে আসছে।