রাজবাড়ী, ১৭ই অগ্রহায়ণ, ১৪২৯ বঙ্গাব্দ, শুক্রবার, ২ ডিসেম্বর ২০২২

করোনা মোকাবিলায় সুশীল সমাজের যেসব প্রস্তাব

প্রকাশ: ১৪ এপ্রিল, ২০২০ ১০:৪৯ : পূর্বাহ্ণ

প্রিন্ট করুন

 

করোনা মোকাবিলায় নিজ নিজ অবস্থান থেকে দায়িত্বশীলতার সঙ্গে কাজ করে যাচ্ছে দেশের সুশীল সমাজ। তবে সার্বিক বিষয় বিবেচনায় পরিস্থিতি উত্তরণে বেশ কয়েকটি প্রস্তাবনা দিয়েছেন সুশীল সমাজের কয়েকজন প্রতিনিধি।  যার মধ‌্যে ক্ষতিগ্রস্তদের বিষয়ে জরিপ চালানো, সাহায‌্যের বিষয় যথাযথ মনিটরিং, দুর্যোগ পরবর্তী অর্থনীতি পুনরুদ্ধার, সম্মিলিত প্রচেষ্টা, স্থানীয় প্রতিনিধির সঙ্গে এনজিওদের সম্পৃক্ত করার বিষয়টি উঠে আসে।

শুধু তাই নয়, এ মুহূর্তে সমাজের সব সেক্টরের যোগ্য মানুষকে একত্রিত করে তাদের মতামত নেওয়ার তাগিদও দেওয়া হয়।  প্রয়োজনে তাদেরকে নিয়ে একটি জাতীয় কমিটি করার কথাও বলা হয়েছে।

দেশে করোনাভাইরাসের প্রভাব মোকাবিলায় কারণীয় নির্ধারণে রাইজিংবিডির সঙ্গে কথা বলেছেন সুশীল সমাজের কয়েকজন প্রতিনিধি।

এ মুহূর্তে সুশীল সমাজের তিনটি গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব সম্পর্কে সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা এ বি মির্জ্জা মো. আজিজুল ইসলাম বলেন, ‘করোনা পরিস্থিতি মোকাবিলায় সুশীল সমাজ যার যার অবস্থান থেকে কাজ করে যাচ্ছে।  এ মুহূর্তে তারা নিজস্ব প্রতিনিধিদের সঙ্গে যোগাযোগ স্থাপন করে কাজ করে যাচ্ছেন। যেহেতু অনেক ক্ষেত্রেই স্বশরীরে গিয়ে কাজ করা সম্ভব হচ্ছে না। তবে ত্রাণ বিতরণ, সাহায‌্য সহযোগিতার ক্ষেত্রে তাদের প্রতিনিধি কাজ করে যাচ্ছেন। তবে এ মুহূর্তে সুশীল সমাজ আরও কয়েকটি কাজ করতে পারে। প্রথমত তারা বিভিন্ন জায়গায় জরিপ করে দেখতে পারেন এ পরিস্থিতিতে কারা কারা ক্ষতিগ্রস্ত বা খাদ্যাভাবে ভুগছেন।  এ সার্ভের প্রতিবেদন সরকারের সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানকে দিয়ে সহায়তা করতে পারে। দ্বিতীয়ত সরকার কর্মহীন অসহায় মানুষদের যে সাহায্য দেওয়ার উদ্যোগ নিয়েছে, তা প্রকৃতপক্ষে বাস্তবায়ন হচ্ছে কি-না তা মনিটরিং করতে পারে। সেক্ষেত্রে অনিয়ম হয়ে থাকলে সরকার সে অনুযায়ী প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেবে। আর তৃতীয়ত এ দুর্যোগ কাটিয়ে ওঠার পর অর্থনীতি পুনরুদ্ধারের জন্য কি ধরনের পদক্ষেপ নেওয়া দরকার সে বিষয়ে মতামত দিতে পারে।’

করোনার প্রভাব মোকাবিলায় সুশীল সমাজের সম্পৃক্ততা বাড়ানোর বিষয়টিতে গুরুত্ব দিয়ে সুশাসনের জন্য নাগরিক (সুজন) এর সম্পাদক ড. বদিউল আলম মজুমদার বলেন, ‘করোনা পরিস্থিতি মোকাবিলায় যার যার অবস্থান থেকে সুশীল সমাজ কাজ করে যাচ্ছে। এটা সর্বব্যাপী সমস্যা, যা সরকারের একার পক্ষে নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব নয়। করোনা পরিস্থিতি মোকাবিলার জন্য সবার সমন্বিত প্রচেষ্টা দরকার। কিন্তু দুর্ভাগ্যজনক হলেও সত্য যে- এ পরিস্থিতি মোকাবিলায় সরকার সমন্বিত উদ্যোগ নেয়নি। এ মুহূর্তে আমরা দুই হাজার গ্রামে স্বেচ্ছাশ্রম দিয়ে যাচ্ছি। তাই এ পরিস্থিতি মোকাবিলার জন্য সবার সম্মিলিত প্রচেষ্টা দরকার। এ মুহূর্তে নাগরিক সমাজের প্রতিনিধিরা যার যার অবস্থান থেকে মানুষের অধিকার নিয়ে কাজ করছেন। এর মধ্যে কেউ অর্থ দিচ্ছেন, কেউবা সচেতনামূলক কর্মসূচি পালন করছে। তবে যারা অর্থ ব্যয় করছেন তাদের সামর্থ‌্য অতি সীমিত। তবে সরকার চাইলে, তারা অনেক সহযোগিতা করতে পারতো। এখন দেড়-দুই কোটি মানুষ ক্ষুধার্ত রয়েছে। এদের কাছে সহায়তা পৌঁছে দেওয়ার ব্যাপারে বেসরকারি সংস্থা অনেক বেশি সহায়তা করতে পারতো। কিন্তু সরকারের পক্ষ থেকে এ ধরনের কোনো উদ্যোগই লক্ষ্য করা যাচ্ছে না।’

তিনি আরো বলেন, ‘এ মুহূর্তে সমাজের সব সেক্টরের যোগ্য মানুষগুলোকে একত্রিত করে তাদের মতামত নেওয়া দরকার। প্রয়োজনবোধে তাদেরকে নিয়ে একটি জাতীয় কমিটি করাও যেতে পারে। আর করোনা শনাক্তের জন্য সারা দেশে ব্যাপকহারে টেস্ট করার ব্যবস্থা নিতে হবে। এর মধ্যে প্রথম সারিতে টেস্ট করতে হবে জরুরি স্বাস্থ্য সেবা নিশ্চিতের কাজে নিয়োজিতদের এবং আইন শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যদের। ক্ষুধার্ত এক-দেড় কোটি মানুষের খাবার ও চলার জন্য অর্থের ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে হবে। কৃষি খাতকে বাঁচিয়ে রাখতে হবে।’

সুশীল সমাজের যার যার অবস্থান থেকে কাজ করার বিষয়ে ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের (টিআইবি) নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান বলেন, ‘সুশীল সমাজ যার যার অবস্থান থেকে কাজ করা উচিত। এক্ষেত্রে তাদের সবার আগে নিজেদের নিরাপত্তা বজায় রাখতে হবে। এ মুহূর্তে যতটুকু সম্ভব সমাজের নাগরিকদের সচেতনতা করতে হবে। সামর্থ‌্য অনুযায়ী মানুষের পাশে দাঁড়ানো উচিত। অসহায়, কর্মহীনদের ত্রাণ বিতরণে সহায়তা করা উচিত। এ মুহূর্তে তারা সভা-সমাবেশ, মিছিল করবে সে পরিস্থিতি নেই। যেহেতু বাহিরে বের হওয়া যাচ্ছে না, সেহেতু যার যার অবস্থান থেকে কাজ করতে হবে। তাদের ওয়ার্ক ফ্রেম পদ্ধতি আছে, সে অনুযায়ী তারা যোগাযোগ রক্ষা করে কাজ করতে পারেন, পর্যবেক্ষণ করতে পারেন, ভার্চুয়ালি প্রতিবেদন প্রকাশ করতে পারেন। এক্ষেত্রে টিআইবিও কাজ করছে। তবে টিআইবি সেবা প্রদানকারী সংস্থা নয়। তবুও নিয়ম নীতির মধ্যে থেকে, এ পরিস্থিতিতেও টিআইবি বিভিন্ন ধরনের কাজ করে যাচ্ছে। করেরানা পরিস্থিতির উপর বিভিন্ন স্টেটমেন্ট ইস্যু করেছে সংস্থাটি।  সরকার যেসব পদক্ষেপ নিচ্ছে তা টিআইবি মনিটরিংয়ের চেষ্টা করছে। সরকারের সেসব কার্যক্রমের স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করতে টিআইবি চাপ অব্যাহত রাখবে।’

রাষ্ট্র বহির্ভুত যেসব অ্যাক্টরদের সরকারি বিভিন্ন উদ্যোগে সম্পৃক্ত করার প্রসঙ্গে সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) সম্মানিত ফেলো প্রফেসর মুস্তাফিজুর রহমান বলেন, ‘সুশীল সমাজ একটি বিশাল কমিউনিটি। এর মধ্যে বিভিন্ন ধরনের মানুষ রয়েছেন। এ মুহূর্তে বুদ্ধিজীবী, ডাক্তার, ইঞ্জিনিয়ার, গবেষক, এনজিওসহ বিভিন্ন সেবা প্রদানকারী প্রতিষ্ঠান নিজ নিজ অবস্থান থেকে ভূমিকা রাখছেন। তবে সাহায্য সহযোগিতার ক্ষেত্রে এনজিও বড় ভূমিকা রাখছে। বিশেষ করে খাদ্য ও স্বাস্থ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে তারা প্রান্তজনদের সঙ্গে কাজ করে যাচ্ছেন। তবে এ মুহূর্তে রাষ্ট্র বহির্ভুত যেসব অ্যাক্টর রয়েছে তাদেরকে সরকারি বিভিন্ন উদ্যোগে সম্পৃক্ত করা জরুরি। যেমন- দেশে এক কোটি ৯০ লাখ মানুষ ক্ষুধার্ত রয়েছে। তাদেরকে চিহ্নিত করে খাদ্য পৌঁছে দেওয়াটা খুবই কঠিন একটা কাজ। আর এ কাজে সরকারের স্থানীয় প্রতিনিধির সঙ্গে এনজিওদের সম্পৃক্ত করতে পারি তাহলে তাদের তালিকা করা সহজ হবে।’